00:00:00
জয় শ্রীকৃষ্ণ রাধে রাধে। আপনাদের সবাইকে জানাই রাধা অষ্টমী শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন। আজ ভাদ্রপদ মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথি। আমাদের পরম আরাধ্য কৃপাময়ী শ্রী রাধারানীর মহা আবির্ভাব দিবস অর্থাৎ রাধাষ্টমী মহোৎসব। এই চরাচরে শ্রী রাধারানীর মত সৌভাগ্যবতী আর কে আছেন? যাকে পাওয়ার জন্য স্বয়ং ত্রিলোকনাথ শ্রীকৃষ্ণ ব্যাকুল থাকেন। আর যেখানেই রাধারানী যান শ্রীকৃষ্ণ তার অনুগামী হয়ে সখারূপে তার সঙ্গে সঙ্গে চলেন। কঠিন তপস্যা অপূর্ব প্রেম আর নিঃস্বারাক্ত সেবার মাধ্যমেই শ্রী রাধা হয়ে উঠেছেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের প্রাণের থেকেও প্রিয়। মনে করা হয় আজকের
00:00:47
এই পূর্ণ দিনে যে ভক্ত ভক্তি ভরে ও প্রসন্ন চিত্তে রাধাষ্টমীর ব্রতকথা শ্রবণ করেন তাদের জীবনের সমস্ত সংকট ও পাপ দূর হয়ে যায় এবং সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। শাস্ত্র মতে একবার কেবল নিষ্ঠা ভরে এই ব্রত পালন করলেই হাজারটি কন্যাদানের সমান পূণ্য লাভ করা সম্ভব। এমনকি কোন পাপী ব্যক্তিও যদি পরম ভক্তি ভরে এই ব্রত পালন করেন তবে তিনিও শ্রী বিষ্ণুর পরমধামে স্থান লাভ করেন। বৈভত্ত পুরাণ অনুসারে রা শব্দের অর্থ হলো ভক্তি বা ভগবানকে প্রাপ্ত করা। আর ধা শব্দের অর্থ হল মোক্ষ। অর্থাৎ শ্রী রাধার নাম স্মরণ মাত্রেই শ্রীকৃষ্ণ ও
00:01:38
মোক্ষ উভয় লাভ করা হয়। তাহলে আর দেরি না করে ভক্তি ভরে শ্রবণ করা যাক শ্রীমতী রাধারানীর পবিত্র আবির্ভাবের সেই মহিমান্বিত ব্রত কথা। তবে তার আগে শুনে নেব রাধারানীর এক পরম ভক্তের ভক্তি ও ভালোবাসায় ভরা সে হৃদয়স্পর্শী কাহিনী। যা রাধাষ্টমীর এই পবিত্র দিনে শ্রবণ করা অত্যন্ত মঙ্গলময়। তাহলে চলুন আর বিলম্ব না করে শুরু করা যাক আজকের এই পরম পবিত্র ব্রত কথা। অনেক কাল আগের কথা যখন এই ধরাধামে ভক্তি প্রেম আর ঈশ্বরের লীলা কথা মানুষের হৃদয়ে আরো গভীরভাবে প্রবাহিত হতো। বৃন্দাবনের পবিত্র ভূমিতে তখন প্রতিটি ধুলিকণার সঙ্গে
00:02:25
মিশেছিল [মিউজিক] শ্রীকৃষ্ণের লীলার স্মৃতি। আর সেই পবিত্র ভূমিরই অদূরে একদিন এমন এক শুভক্ষণ উপস্থিত হয়েছিল যার মাহাত্ব আজও ভক্তের হৃদয়ে অপরিসীম আনন্দের সঞ্চার করে। সেদিন বর্ষানা গ্রামটি যেন কোন মর্তের স্থান নয়। সাক্ষাৎ বৈকুন্ঠপুরী। ভাদ্রমাসের শুক্লা অষ্টমী তিথি। চারিদিকে এক অন্যরকম আনন্দ। এক অনবীল শিহরণ। আজ যে তাদের প্রাণের ঠাকুর বর্ষানার রাজকুমারী শ্রী রাধার জন্মতিথি। পাহাড়ের উপরে রাজপ্রাসাদের চূড়া থেকে [মিউজিক] শুরু করে নিচের ছোট ছোট কুড়েঘর সব জায়গায় আজ যেন আনন্দের নদী বয়ে চলেছে সকালের প্রথম
00:03:08
আলো ফুটতেই মেঠোপথ ধরে সারি সারি মানুষ হেঁটে চলেছে মন্দিরের দিকে কারো হাতে ফুলের সাজি কারো হাতে রঙিন পতাকা সজ্জিত উপহার বাতাসের ছন্দে ভেসে আসছে ঢাক ঢোল আর খোল করতালের মিষ্টি সুর বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ আর ধূপের ধোয়া মিলে মিশে এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি করেছে। গলি থেকে গলিতে কেবল একটাই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রাধে রাধে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি আজ নতুন রূপ পেয়েছে। ঘরের দরজায় দরজায় আল্পনা আঁকা হয়েছে। টাঙ্গানো হয়েছে আমপাতার তরণ। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন কাপড় পড়ে আনন্দের ঠেলায় রাস্তায় দাপাদাপি করছে। তাদের
00:03:52
রঙিন জামার আঁচল বাতাসে উড়ছে যেন এক ঝাঁক প্রজাপতি বর্ষানার পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রবীণরা সকালে যমুনার জলে স্নান সেরে জপমালা হারে মন্দিরের দিকে পা বাড়াচ্ছেন। তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তির হাসি। চোখে রাধারানীকে দেখার ব্যাকুলতা। পাহাড়ের চুড়ায় রাজা বৃশভানু আর মাতা কীর্তিদার প্রাসাদে আজ মহা ধুমধাম। রাজবাড়ির বিরাট তরণ সুগন্ধি রজনীগন্ধা আর গেদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। ভেতরের প্রাঙ্গণে কাঁচের দীপাক আর সোনার প্রদীপের আলো একসাথে ঝলমল করছে। দেশ-বিদেশ থেকে এসেছে নামজাদা সব রন্ধন শিল্পী। তারা বিশাল আকার সব পাত্রে ক্ষীর পায়েশ নানা
00:04:37
পদের মিষ্টান্য আর রাজকীয় ব্যঞ্জন তৈরিতে ব্যস্ত। রান্নাবাড়ির মৌ গন্ধে চারপাশ ভরপুর। প্রাসাদের পরিচারক পরিচারিকারা নতুন পোশাক পড়ে এদিক ওদিক ছোটছুটি করছে। কোথাও যেন সামান্য ভুল না হয়। পুরোহিত মহাশয় শুভ [মিউজিক] লগ্ন ধরে একের পর এক বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। ঢাকিরা কাঁধে ঢোল ঝুলিয়ে এক অদ্ভুত ছন্দে [মিউজিক] কাঠি ছোঁয়াচ্ছে। যার তালে তালে গ্রামের মানুষের হৃদয় আনন্দে নেচে উঠছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্রী রাধার বিগ্রহকে আজ নতুন রেশমী বস্ত্রে সাজানো হয়েছে। তার গায়ে মুক্তর মালা, কপালে চন্দনের তিলক আর চরণে
00:05:18
নুপুর। রূপ যেন উপচে পড়ছে। সাধারণ মানুষ তো বটেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বড় বড় ব্যবসায়ী আর গুণীজনেরা নিজেদের সাধ্যমত সোনা, রূপ আর বহুমূল্য রেশমী পোশাক রাজবাড়ির দরজায় উপহার হিসেবে জমা দিচ্ছে। সবাই চাইছে আজ লাডলি রাধারানীকে খুশি করতে। কারণ বর্ষানাবাসীর কাছে শ্রী রাধা কেবল কোন দেবী নন, তিনি তাদের নিজেদের ঘরের মেয়ে তাদের সমস্ত সুখ-দুঃখের একমাত্র আশ্রয়। রাজা বৃষভানুর মুখে আজ এক পরম তৃপ্তির হাসি। তিনি নিজের হাতে আসা অতিথি ও সমস্ত প্রজাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। প্রাসাদের উঠনে দ্বীন দুঃখী থেকে শুরু করে সাধুসন্ত কাউকে
00:06:01
বাদ দেওয়া হয়নি। সবাইকে নতুন পোশাক বিতরণ করা হচ্ছে। মিষ্টি খাওয়ানো হচ্ছে। সমস্ত বর্ষা যেন এক হয়ে গেছে রাধারানীর এই শুভ আগমনের আনন্দে। পুরো বর্ষানা যখন আলোর রৌশনা আর উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা ঠিক তখনই গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে এক নির্জন কোণে খা করছিল একটা জরাজীর্ণ কুড়েঘর। বাঁশের বাখারি আর ছেড়া তালপাতার চাল দিয়ে তৈরি সেই ঘরটির দিকে তাকালেই বোঝা যেত কতকাল সেখানে কোন আনন্দের আলো জ্বলেনি। সেই ভাঙ্গা কুড়েঘরের এক কোণে মাটির ঠান্ডা মেঝেতে বসেছিলেন এক বৃদ্ধা। তার বয়স কত তা তিনি নিজেও জানেন না। মুখের চামড়া শুকিয়ে একদম কুকড়ে গেছে।
00:06:46
মাথায় ধবধবে সাদা চুল আর দৃষ্টিশক্তিও ভাবসা হয়ে এসেছে। শরীরে কোন শক্তি নেই। উঠে দাঁড়াতে গেলেই হাত-পা থরথর করে কাঁপে। সংসারে তার কেউ নেই। না আছে স্বামী না কোন সন্তান বা আপনজন। এই বিশাল জগতে তিনি একেবারেই একা। সঙ্গী বলতে কেবল এক ভেঙে যাওয়া কাঠের লাঠি আর একটা পুরনো মাটির ঘড়া। বৃদ্ধার কাছে কোন ধনসম্পদ ছিল না। এমনকি প্রতিদিন দুবেলা পেট ভরে খাওয়ার মত একমুঠো দানা পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু তার বুকের ভেতর জমা হয়েছিল এক বিপুল ধন। যা জগতের কোন রাজপ্রাসাদেও পাওয়া যায় না। তা হলো তার প্রাণের দেবী শ্রী রাধার প্রতি নিঃস্বার্থ আর অগাধ
00:07:31
ভালোবাসা। আজ রাধা অষ্টমী। শ্রী রাধার জন্মতিথি ঘরের চালের ফাটল দিয়ে আসা বাইরের উৎসবের বাদ্দি আর রাধে রাধে ধ্বনি বৃদ্ধার কানে আসছিল বর্ষানার আর সবার মতো তার মনটাও [মিউজিক] আজ নেচে উঠতে চাইছিল তিনি মনে মনে ভাবছিলেন আজ আমার আদরীয় রাধারানীর জন্মদিন বর্ষানার ঘরে ঘরে আজ কত আলো কত আয়োজন রাজবাড়িতে কত শত খাবার রান্না হচ্ছে রাধারানীকে কত সুন্দর পোশাক পড়াচ্ছে সবাই আর আমি আমি কেমন হতভাগী আমার ঘরে এক চিলতে আলো জ্বালানোর মত তেলটুকুও নেই। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই বৃদ্ধার ঝাপসা চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো। বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় মুচড়ে
00:08:17
উঠলো। তিনি দেওয়ালে ভর দিয়ে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের এক কোনে রাখা একটা পুরনো মাটির পাত্রে হাত দিয়ে দেখলেন সেখানে একটা চালের দানাও পড়েনি। গতকাল রাত থেকেও তিনি কিচ্ছু খাননি। কিন্তু নিজের পেটের খুঠার কথা আজ তার একদম মনে ছিল না। তার কেবল একটাই ভাবনা। আমি আমার মেয়ে রাধারানীকে আজকের দিনে কি উপহার দেব। রাজবাড়ির ধনী লোকেরা তো সোনা দানা আর কত রকমারি খাবার নিয়ে যাবে। আমি যে কিছুই দিতে পারবো না। উদ্বেগ আর ব্যাকুলতায় বৃদ্ধার বুক দুরু দুরু করে কাঁপতে লাগলো। তিনি হাতের জীর্ণ লাঠিটা [মিউজিক] শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। চোখ থেকে
00:08:56
গড়িয়ে পড়া জল আঁচল দিয়ে মুছে তিনি ভাবলেন, না আজ আমি খালি হাতে বসে থাকতে পারি না। আমার রাধারানী যে শুধু রাজরাজোড়াদের নয় আমারও তো বটে। সবাই যদি তাকে কিছু না কিছু দেয় তবে আমিও দেব। কিন্তু আমি পাবো কোথায়? বৃদ্ধার মনে হলো সারা বর্ষা না আজ আনন্দে ভাসছে। আর তিনি কেবল নিজের দারিদ্র্যের জন্য পিছিয়ে পড়বেন না। তিনি ভিক্ষা করবেন। প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাত পাঁধবেন। কিন্তু আজকের এই পবিত্র [মিউজিক] দিনে শ্রী রাধার জন্য কিছু একটা উপহার তাকে জোগাড় করতেই হবে। লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি কুড়েঘাড়ির বাইরে এলেন। রোদের আলো চোখে
00:09:36
পড়তেই তিনি হাত দিয়ে চোখ আড়াল করলেন। ধুলি মলিন ছেড়া কাপড়টা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে গ্রামের ভেতরের দিকে পা বাড়ালেন। মন ভরা গভীর আকুতি আর চোখে একরাসি জলের ধারা নিয়ে এক নিঃশ্ববৃদ্ধা বেরিয়ে [মিউজিক] পড়লেন নিজের প্রাণের দেবীর জন্য উপহারের খোঁজে। পথের ধুলোবালি আর পাথরের কুচি বৃদ্ধার খালি পায়ে বিধ ছিল। কিন্তু সেদিকে তার কোন খেয়াল ছিল না। তার মন জুড়ে কেবল একটাই চিন্তা। আজ রাধারানীর জন্মদিনে তাকে কি নিবেদন করবেন? তিনি পথচলতি এক গৃহস্থের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। উঠনে গৃহবধুটি
00:10:13
নতুন কাপড় পড়ে পূজোর তোড়জোড় করছিল। বৃদ্ধা ওটি কষ্টে হাত দুটি জোর করে কাঁপা গলায় বললেন, ওমা আজ তো আমাদের আদরীয় রাধারানীর জন্মদিন। আমাকে একটু চাল দেবে গো। আমি যে আজ শ্রী রাধার চরণে সামান্য একটু প্রসাদ নিবেদন করব। গৃহবধুটি বিরক্তি ভরা চোখে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে কাজের মাঝে এমন কাঙালকে দেখে সে মুখ ঘুরিয়ে বলল, আহা এখন কাজের মহা ব্যস্ততা। আর উনি এসেছেন ভিক্ষা করতে। যাও যাও এখান থেকে সরো তো। আজ মন্দিরে হাজার হাজার মানুষ প্রসাদ পাবে রাজবাড়িতে কত বড় ভোজ হচ্ছে আর তুমি এক মুঠো চাল দিয়ে রাধারানীকে ভোগ দেবে সরো
00:10:53
সামনে থেকে সরো মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল বৃদ্ধা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হাঁটতে শুরু করলেন। পরের বাড়িতে গিয়ে যখন একই অকুতি জানালেন সেখানকার মালিক রুঢ় গলায় বলে উঠলো ভিক্ষুকদের অভাব নেই এ গ্রামে। আজ আনন্দের দিন এই দরজায় এসে অলক্ষণে কান্না কেঁদো না তো রাধারানী কি তোমার ওই ভিখারীর দেওয়া চাল খাওয়ার জন্য বসে আছেন কত নামি দামি শ্রেষ্ঠীরা সোনা আর হিরে উপহার দিচ্ছে খবর রাখো এমন কটুক্তি আর অপমান সয়ে বৃদ্ধার শরীর যেন আরো ভেঙে পড়তে চাইল একবাড়ি দুই বাড়ি তিন বাড়ি যাদের দরজায় যান সেখান থেকেই জোটে অবহেলা
00:11:36
তাচ্ছিল্য আর তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় কেউ বলল আজ আমাদের ঘরে ঘরে পুজোর কাজ ছোঁয়াছুই করো না। কেউ আবার বলল সকাল সকাল মাথা খেতে চলে এসেছে। বৃদ্ধার চোখের জলে গাল ভেসে যেতে লাগলো। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি মনে মনে শ্রী রাধার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, হে রাধে, সবাই সত্যি কথাই বলছে রে মা। তুই বর্ষানার রাজকুমারী। তোর দরবারে কত বড় বড় ধনী লোক সোনার থালায় 24 ব্যঞ্জন সাজিয়ে দিচ্ছে। আর আমি এক কাঙ্গাল। আমার যে তোকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। কিন্তু মা ভালোবাসার কোন দাম হয় না রে। এক মুঠো চালের জন্য তোর এই বুড়ো মা আজ দরজায়
00:12:18
দরজায় ঘুরছে। তুই কি দেখতে পাচ্ছিস না? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। রোদ তে উঠেছে পেটের ভেতর ক্ষুধার জ্বালা আর ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ণ বৃদ্ধা এক অসথ্য গাছের তলায় বসে একটু জিড়িয়ে নিলেন। বুক ফাটা কষ্টে তিনি ভেবেছিলেন আজ হয়তো আর কিছুই জোগাড় হবে না। খালি হাতেই ফিরে যেতে হবে। ঠিক এমন সময় এক পথচলতি ছোট কিশোরী বালিকা যার গায়ে অত্যন্ত সাধারণ এক কাপড় পড়া বৃদ্ধার কাছে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটির মুখখানা দেখে মনে হচ্ছিল যেন চাঁদের আলো। মেয়েটি মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করল, উদির মা তুমি এমন গাছের তলায় বসে কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার? বৃদ্ধা চোখের
00:13:03
জল মুছতে মুছতে বললেন, কি বলবো রে মা? আজ আমার আজরিয়ের জন্মদিন। সারা বর্ষানা সাজছে। সবাই তাকে কত কিছু উপহার দিচ্ছে। আর আমি একটা চালের দানাও জোগাড় করতে পারলাম না। সবাই তাড়িয়ে দিল রে। সবাই বলল কাঙ্গালের নাকি রাধারানীকে কিছু দেওয়ার অধিকার নেই। কিশোরীটি মুচকি হেসে বলল, কে বলেছে অধিকার নেই? তুমি এই গলি পেরিয়ে ওই ছোট কুড়েঘরটার পেছনে যাও। ওখানে এক ভালো মা থাকেন তিনি তোমাকে ফেরাবেন না। কিশোরীর কথা শুনে বৃদ্ধা আবার আসার আলো পেরেন। লাঠিটা আঁকড়ে ধরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। নির্দেশমত সেই গলি দিয়ে হেঁটে একটি
00:13:44
দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ভেতরের সদয় গৃহবধুটি বৃদ্ধার করুণ দশা দেখে দয়া পরবশ হলেন। বৃদ্ধা যখন ধীর গলায় এক মুঠো চালের আকুতি জানালেন তখন সেই মহিলা ঘরের ভেতর থেকে নিজের ভাড়ার থেকে আঁচল ভরে কিছুটা কাঁচা চাল এনে বৃদ্ধার মাটির পাত্রে ঢেলে দিলেন। মাটির পাত্রে চাল পড়ার শব্দটা বৃদ্ধার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে মধুর সুর বলে মনে হলো। তিনি দুই হাতে সেই কাঁচা চালগুলো জড়িয়ে ধরলেন। আঁচল দিয়ে চালের কণাগুলো ঢেকে নিলেন যেন কোন অমূল্য রত্ন পেয়েছেন। অঝোর ধারায় জল পড়তে লাগলো তার চোখ থেকে। অবশেষে তিনি পেয়েছেন। সোনাদানা নয় রেশমী
00:14:26
পোশাক নয় কেবল একমুঠো কাঁচা চাল। কিন্তু এর ভেতরে মিশেছিল এক বৃদ্ধা ভক্তের সারা জীবনের জমানো ভালোবাসা, চোখের জল আর অতুলনীয় ভক্তি। চালের পাত্রটি বুকে চেপে ধরে বৃদ্ধা হাঁটা দিলেন পাহাড়ি পথ ধরে মন্দিরের দিকে। যেখানে আজ বর্ষানার রাজকুমারী শ্রী রাধার পরম পূজনীয় জন্মতিথি পালিত হচ্ছে। পাহাড়ের ওপরে বর্ষানার মূল মন্দিরটি আজ যেন এক টুকরো স্বর্গলোক। যতদূর চোখ যায় কেবল আলোর চমক আর সাজসার পাহাড়। মন্দিরের বাইরে উঁচু তরুণ থেকে শুরু করে ভেতরের মূল গর্ভগৃহে যাওয়ার পথ পর্যন্ত সুগন্ধি দেশি ফুল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। গাঁদা,
00:15:10
রজনীগন্ধা, গোলাপ আর বেলফুলের মালায় মোড়া চারপাশ থেকে এক মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। বাতাসের ধূপ আর ধুনোর ধোঁয়া এমন এক রূপকথা তৈরি করেছে যা দেখলে যে কারো চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নামার প্রতিটি সিঁড়িতে জ্বালানো হয়েছে হাজার হাজার ঘিয়ের প্রদীপ। সন্ধ্যার হালকা আলো নামতেই সেই প্রদীপের শিখা গুলো বাতাসে দোলা খেতে শুরু করেছে। [মিউজিক] যেন তারা নিজেরাই রাধারানীর রূপের আলোয় নাচছে। মন্দিরের চারপাশের চত্তরে বর্ষানার সাধারণ মানুষের সঙ্গে এসে ভিড় জমিয়েছেন দেশের নামজাদা সব ধনকুবের বড় বড় শ্রেষ্ঠী আর জমিদাররা। তাদের পরণে জাগজমক
00:15:52
পূর্ণ রেশমী পোশাক, গলায় মুক্ত আর হীরের মালা আর মাথায় সোনার সুতো দিয়ে বোনা বহুমূল্য পাগড়ি। ধনী ভক্তদের সঙ্গে এসেছে তাদের দলবল ও সেবকরা। তারা বিরাট বিরাট সোনার ও রুপর [মিউজিক] থালা বয়ে নিয়ে আসছে। সেসব থালায় সাজানো রয়েছে নানা ধরনের উপঢৌকন। কেউ এনেছেন খাঁটি সোনার তৈরি নুপুর। কেউ এনেছেন হিরে বসানো সোনার মুকুট। আবার কেউ এনেছেন ঢাকাই ও বেনারসী রেশমের দামি শাড়ি। কেবল রত্ন অলংকারী নয় রাধারানীর ভোগের জন্য তৈরি করা হয়েছে 24 ব্যঞ্জন আর 56 ভোগ। সোনার বড় বড় পাত্রে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা রকমের সুস্বাদু
00:16:33
খাবার। ঘন ক্ষীর, ছানার পায়েশ, ঘিয়ে ভাজা গরম গরম মালপোয়া, পেড়া, লাড্ডু, কত রকমের বরফি আর মিষ্টাান্য। এছাড়াও রয়েছে সুগন্ধি চালের পোলাও নানা রকমের সবজি আর সুস্বাদু পদ খাবারের এমন মনোমান্তকর গন্ধে পুরো মন্দির প্রাঙ্গন গমগম করছে সেই ধনী শ্রেষ্ঠীরা যখন রাজকীয় পোশাক পড়ে মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলেন তাদের চোখে মুখে ভেসে উঠছিল এক গভীর অহংকার তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে দেখাচ্ছিলেন কার উপহার কত বেশি দামি কার আনা সোনার থালাটা কত বেশি ভারী এক ধনী শ্রেষ্ঠী তার পাশে থাকা সেবককে বেশ উঁচু গলায় বললেন, দেখেছো তো
00:17:16
এই হিরে বসানো হারটি বানাতে রাজস্থানের বিখ্যাত কারিগরদের ছয় মাস সময় লেগেছে। আজ শ্রী রাধা আমার এই উপহার দেখলে নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। এই রকম উপহার পুরো বর্ষায় আর কেউ আনতে পেরেছে। অন্য এক ব্যবসায়ী আবার নিজের সোনার থালায় রাখা রকমারি মিষ্টির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আমার এই 56 ভোগ তৈরি করতে খাঁটি ঘি আর সুগন্ধি মসলা আনা হয়েছে দূর-দূরান্ত থেকে। এমন রাজকীয় আয়োজন আজ পর্যন্ত এই মন্দিরে হয়নি। রাধারানীকে তুষ্ট করতে কোন কমতি রাখিনি আমি। তাদের এই কথা শুনে বাকি ধনী ভক্তদের মুখেও এক বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সবাই যেন এক
00:17:58
অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলেন। কে কত বেশি ধন-সম্পদ দেখিয়ে শ্রী রাধার মন জয় করতে পারেন। উপহারের আলো আর সোনার চমকে চারপাশ ঝলমল করলেও সেই ধনরত্নের আড়ালে কোথাও যেন খাঁটি ভক্তির সেই নিঃস্বার্থ সুরটা হারিয়ে যাচ্ছিল। বাহ্যিক এই চটক জাগজমক আর ধনের অহংকারে মন্দিরের রূপর রূপকথার মতো মনে হলেও পুরো পরিবেশটা যেন কেমন একটা দেখনদারি ও কৃত্রিমতায় ভরে উঠেছিল। ধনী ভক্তরা যখন ঢাকঢোলের বাদ্দি আর নিজেদের নাম ডাকের বড়াই করতে করতে একের পর এক মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করছিলেন তখন সাধারণ মানুষ কেবল দূর থেকে অবাক হয়ে সেই বৈভব দেখছিল।
00:18:40
সোনার দুতি আর সুগন্ধির মেলায় আজ পুরো প্রাসাদোপম মন্দির রূপপুরীর রাজদরবারের মত সাজলেও তার ভিতরে প্রকৃত অনুরাগের অভাব ছিল স্পষ্ট। ধনীদের এই দেখদারির আয়োজন আর অহংকারের মায়াজালেই আজ সেজে উঠেছিল বর্ষানার মূল মন্দির প্রাঙ্গণ। এক মুঠো চাল আঁচলে শক্ত করে বেঁধে লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বৃদ্ধা যখন মন্দিরের মূল তরুণের সামনে এসে পৌঁছলেন তখন তার মুখে এক পরম তৃপ্তির হাসি পেটের ক্ষুধা শরীরের ক্লান্তি আর পথের ধুলবালির কষ্ট সব যেন এক মুহূর্তে উবে গেছে তার মনে কেবল একটাই আনন্দ অবশেষে তিনি তার প্রাণের আদরীয়
00:19:22
রাধারানীর জন্য উপহার নিয়ে আসতে পেরেছেন। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা হাত দুটো কপালে ঠেকিয়ে শ্রী রাধার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন। তারপর জীর্ণ কাপড়ের আঁচলটা ভালো করে ঢেকে সাবধানে প্রতিটি সিঁড়িতে পা ফেলতে লাগলেন। কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্ত বেশি সময় স্থায়ী হলো না। মন্দিরের মূল ফোটোকে [মিউজিক] দাঁড়িয়েছিল রাজবাড়ির দীর্ঘদেহী উগ্র চেহারার প্রহরীরা। তাদের পরণে ছিল জাগজমক পূর্ণ পোশাক আর হাতে শক্ত লাঠি। ধনী শ্রেষ্ঠী আর জমিদারদের সোনার থালা হাতে ভেতরে যেতে দেখে তারা অতি নম্রভাবে পথ ছেড়ে দিচ্ছিল। কিন্তু যখনই তাদের চোখ
00:20:02
পড়ল ধুলমলিন জীর্ণ কাপড়ে ঢাকা রোগাপটকায়ী বৃদ্ধার উপর তখনই তাদের মুখ হিংস্র হয়ে উঠল। এক প্রহরী গর্জনে কেঁপে উঠলো চারপাশ। থামো কোথায় যাচ্ছ এই বেশে? বৃদ্ধা থমকে দাঁড়ালেন। তিনি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নম্র গলায় বললেন, বাবা আজ যে আমার রাধারানীর জন্মদিন, আমি আদরীয়কে একটু প্রসাদ নিবেদন করতে চাই। আমাকে ভেতরে যেতে দাও। কথাটা শুনে প্রহরীরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। অন্য এক প্রহরী ঘৃণায় মুখ বাঁকিয়ে বলল, প্রসাদ নিবেদন করবে তুমি? হাত মুখের যা দশা কাপড়ের যা ছিঁড়ি ভেতরে বড় বড় শ্রেষ্ঠীরা সোনার থালায় 24 ব্যঞ্জন
00:20:43
চড়াচ্ছেন আর তুমি এসেছো রাজকীয় মন্দির নোংরা করতে থং দেখে আর বাঁচি না বৃদ্ধা ব্যাকুল হয়ে আঁচলের কুণ থেকে সেই মাটির পাত্রটি বের করে দেখালেন পাত্রের ভেতরে পড়ে আছে কেবল এক মুঠো কাঁচা চাল তিনি চোখের জল ফেলতে ফেলতে মিনতি করলেন বাবা আমি তো সোনাদানা পাবো কোথায় সারা গ্রাম ঘুরে কেবল এই এক মুঠো চাল জোগাড় করেছি। এই চালটুকুই যে আমার রাধারানীর প্রতি সব ভালোবাসা। আমাকে একবার মায়ের চরণ ছোয়ার সুযোগ দাও বাবা। আমি কোন ভিড় করবো না। কেবল দূর থেকে চালটুকু রেখে চলে আসবো। বৃদ্ধার এই আকুতি প্রহরীদের পাথরের মত মনকে বিন্দুমাত্র গলাতে পারলো না। বরং
00:21:24
কাঁচা চাল দেখে তাদের অহংকার আরো বেড়ে গেল। এক প্রহরী রাগের মাথায় হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধার হাত থেকে মাটির পাত্রটি একরকম ছিনিয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিল। মট করে শব্দ হয়ে মাটির পাত্রটি ভেঙে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল। আর বৃদ্ধার সারাদিনের সাধনার সেই একমুঠো চাল ছড়িয়ে পড়লো মন্দিরের সিঁড়ির ধুলোবালিতে। ভাগো এখান থেকে। কাঙ্গালের চালের জন্য রাধারানী বসে নেই। এই বলে প্রহরী বৃদ্ধাকে সজোরে ধাক্কা দিল। বৃদ্ধা সামলাতে না পেরে সিঁড়ির উপর আছড়ে পড়লেন। তার বুড়ো হাঁটু আর হাতে শক্ত পাথরের আঘাত লাগলো। চামড়া ছড়ে গিয়ে
00:21:59
রক্ত বেরিয়ে এল। কিন্তু শরীরের সেই যন্ত্রণার চেয়েও শতগুণ বেশি যন্ত্রণা হচ্ছিল তার হৃদয়ে। চোখের সামনে সিঁড়ির নোংরা ধুলোর সঙ্গে মিশে যাওয়া চালের দানা গুলোর দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধার বুক ফাটা কান্না বেরিয়ে এল। পাথরের সিঁড়িতে বসে তিনি নিজের ছেড়া আঁচল দিয়ে ছড়ানো চালগুলো কুড়োতে চেষ্টা [মিউজিক] করলেন। কিন্তু ধুলো আর বালির সঙ্গে চালের দানাগুলো এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে সেগুলো আর কুড়ানো যাচ্ছিল না। ধনী ব্যক্তিরা সেই পথ দিয়েই দামি পোশাক সামলে বৃদ্ধাকে ডিঙ্গিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছিল। কেউ একটিবার ফিরেও তাকালো না। কেউ একটা সমবেদনার কথাও
00:22:34
বলল না। ধন আর ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ প্রহরীরা বৃদ্ধাকে আরো দূরে সরিয়ে দিতে লাগল। অসহায় বৃদ্ধা ধুলোর উপর বসে কেবল কাঁদতে লাগলেন। যে প্রদীপ জ্বালাতে তিনি এত পথ হেঁটে এসেছিলেন তা যেন মন্দিরের দ্বারে এসে এক নিমেশে নিভে গেল। এক মুঠো ভালোবাসা নিয়ে এসে কেবল অপমান আর আঘাত পেয়ে মন্দিরের বাইরে পড়ে রইলেন এক ভক্ত। নোখ দিয়ে মাটি আঁচড়েও চালগুলো কুড়োতে না পেরে তিনি নিজের দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। চারপাশে উৎসবের কত না বাদ্যবাদ ছিল। জয়ধ্বনি আর শঙ্খের শব্দে আকাশ-বাতাস মুখরিত হচ্ছিল। কিন্তু সেই আনন্দঘন সুরের
00:23:17
মধ্যে এই বৃদ্ধার নিঃশব্দ কান্নার আওয়াজ শোনার মতো কেউ ছিল না। বৃদ্ধা মাটির ওপর মাথা রেখে অঝোরধারার চোখের জল ফেলতে ফেলতে মনের গভীর ব্যাকুলতায় বলতে লাগলেন, হে করুণাময়ী রাধে, হে বর্ষানার রাজকুমারী, তুমি তো সবার মনের কথা জানতে পারো। আমার মনের কষ্ট কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না? আজ তোমার জন্মদিনে সবাই তোমাকে কত সুস্বাদু খাবার আর সোনার গয়না উপহার দিচ্ছে। কিন্তু আমার তো সোনাদানা দেওয়ার মত কোন সামর্থ্য ছিল না মা। সারাদিন দ্বারে দ্বারে ঘুরে কতজনের গালাগাল আর অপমান শোয়ে কেবল এই একমুঠো চাল জোগাড় করেছিলাম। ভেবেছিলাম এই তুচ্ছ চালটুকুই
00:24:05
তোমার চরণে ঢেলে দিয়ে বলব মারে তোর এই কাঙাল মা তোকে ভালোবাসে। বৃদ্ধার চোখ থেকে ঝরে পড়া নন্তা জল সিঁড়ির শুকন ধুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তিনি নিজের জীর্ণ কাপড় দিয়ে সিঁড়ির মাটি মুছতে মুছতে আকুল কন্ঠে মিনতি করতে লাগলেন। আজ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রূপ ও ধনের অহংকারে মত্ত মানুষেরা আমাকে তাড়িয়ে দিল। তারা বলল আমার দেওয়া চাল নাকি তোমার মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট করবে? তবে কি সত্যি আমার দেওয়া উপহার গ্রহণ করার কোন অধিকার নেই? তবে কি কাঙালের ভালোবাসা তোমার দরবারে পৌঁছায় না মা? তিনি ধুলো মাখা হাত দুটো আকাশের দিকে তুলে
00:24:49
গলার সমস্ত জোর দিয়ে ডেকে উঠলেন, হে আমার আদরণীয়। আমার যে ধনসম্পদ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু আমার হৃদয়ের সমস্ত ভক্তি আর ভালোবাসা তো কেবল তোমার জন্যেই ছিল। আজ যদি আমি সত্যিই তোমার সন্তান হয়ে থাকি তবে এই ধুলইয় মিশে যাওয়া কাঁচা চালের দানাকেই তুমি গ্রহণ করো। তোমার দেওয়া এই কষ্ট আমি হাসি মুখে মেনে নেব। কিন্তু তোমার দর্শন না পেয়ে তোমার আশীর্বাদ না নিয়ে আমি এই ধুলো ছেড়ে কোথাও যাবো না। দরকার হলে এই সিঁড়িতে বসেই আমি প্রাণ বিসর্জন দেব। বৃদ্ধার এই বুক ফাটা আকুতি আর অস্ত্রশিক্ত ডাক যেন বাতাসের সাথে মিশে
00:25:31
মন্দিরের উঁচু চূড়া পেরিয়ে এক অলৌকিক জগতে পৌঁছে গেল। মন্দিরের ভেতর 24 ব্যঞ্জনের গন্ধে চারপাশ মম করছিল। কিন্তু মন্দিরের বাইরে পড়ে থাকা এক কাঙাল ভক্তের এই নিঃস্বার্থ কান্না আর হৃদয়ের আকুল ভালোবাসায় আকাশ-বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে এল। বৃদ্ধা ধুলোর ওপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতেই নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে লাগলেন। তিনি জানতেন না তার এই অশ্রুজল আর ব্যাকুলতা কেবল মন্দিরের পাথরকেই ভেজায়নি। তা বর্ষা ধামের পরমেশ্বরীর আসল হৃদয়কেও আলোড়িত করে তুলেছে। মন্দিরের ভেতর তখন রাজকীয় ভোগের মহাউৎসব চলছে। সুবর্ণ থালায় সাজানো 24 ব্যঞ্জন ও 56
00:26:19
ভোগ। সোনার প্রদীপের ঝলমলে আলোয়ে পুরো গর্ভগৃহে আলো আর সুবাসের প্লাবন। বড় বড় পুজো দিয়ে ধনী ভক্তরা অহংকারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন কিভাবে তাদের আনা ক্ষীর, পায়েশ আর দামি উপহার শ্রী রাধার চরণে নিবেদন করা হচ্ছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল এক পরম অলৌকিক ও অলক্ষিত ঘটনা। মন্দিরের ভেতরের সমস্ত চটক [মিউজিক] আরম্বরের মাঝেও শ্রী রাধার মন সেখানে ছিল না। বাইরে সিঁড়ির ওপর পড়ে থাকা তার সেই বৃদ্ধা ভক্তের অঝর কান্নার শব্দ তার বুক ফাটা আকুতি আর ধুলয়ে মিশে যাওয়া একমুঠো কাঁচা চালের বেদনাময় ভালোবাসা সোজা এসে পৌঁছলো শ্রী রাধারানীর
00:27:06
হৃদয়ে। সোনার থালায় সাজানো অতশত রাজকীয় মিষ্টি ও ব্যঞ্জন শ্রী রাধার কাছে এক নিমেশে একদম স্বাদহীন ও অর্থহীন হয়ে গেল। ধনী ভক্তদের অহংকারের পাহাড় তার কাছে ভারী বোধ হতে লাগলো। আর বাইরে ধুলোয়ে লুটিয়ে থাকা বৃদ্ধার অশ্রুশিক্ত ভালোবাসায় তার আসন যেন কেঁপে উঠলো। আসল ভক্তির অর্ঘ পড়ে আছে মন্দিরের বাইরে সিঁড়ির ধুলোবালি ও কঙ্করের ওপর। তার কাঙাল মায়ের অশ্রুজল আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি। ভক্তের ব্যাকুলতা কাঙ্গাল করে তুলল পরমেশ্বরী রাধারানীকে। গর্ভগৃহের সবাই যখন সোনাদানার হিসাব আর ঢাকের বাদ্যে মেতে আছে তখনই শ্রী রাধা পরম অলৌকিকভাবে
00:27:53
এক অপূর্ব লীলা রোজলেন। পরম জ্যোতি ছড়িয়ে তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করলেন। এক মুহূর্তে তিনি রূপ নিলেন অত্যন্ত সাধারণ নমনীয় ও করুণাময়ী এক কিশোরী বালিকার। তার গায়ে কোন অলংকার নেই। মাথায় সোনা হীরের মুকুট নেই। পরনে কেবল এক অতি সাধারণ সুতো দিয়ে বোনা শাড়ি। সাধারণ এক গ্রাম্য বালিকার রূপ ধরে তিনি সকলের নজর এড়িয়ে প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে হালকা পায়ে অলৌকিকভাবে মন্দিরের ভেতরের গর্ভগৃহ থেকে বের হয়ে এলেন। সোনার প্রদীপের আলো ছাড়িয়ে 24 ব্যঞ্জনের সুবাস ডিঙ্গিয়ে তিনি পা বাড়ালেন সেই অন্ধকার শ্রেণীর দিকে যেখানে এক আকুল ভক্ত নিজের সর্বস্ব
00:28:36
হারিয়ে ধুলইয় লুটিয়ে কাঁদছিলেন। রাজপ্রাসাদের 56 ভোগ স্পর্শ পর্যন্ত না করে শ্রী রাধা স্বয়ং নেমে এলেন বাইরের ধুলালিম চত্তরে। মন্দিরের তোর পেরিয়ে সেই বালিকা যখন সিঁড়ির কাছে পৌঁছলেন তখন চারপাশের বাতাস যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। সিঁড়ির উপর শুয়ে থাকা বৃদ্ধা তা টের পাননি। তিনি তখনো দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছেন। আর রাধারানীর নাম জপ করছেন। বালিকাটি পরম মমতায় বৃদ্ধার পাশে গিয়ে বসে পড়লেন। তার কোমল দুটো হাত দিয়ে তিনি বৃদ্ধার ধুলোমাখা কাঁদ স্পর্শ করলেন। সেই স্পর্শে এমন এক অলৌকিক শীতলতা
00:29:17
ছিল যা অনুভব করতেই বৃদ্ধার কেঁপে [মিউজিক] ওঠা শরীর শান্ত হয়ে এল। বালিকা মিষ্টি মধুর গলায় বলে উঠলেন ওমা তুমি এমন ধুলোয়ে বসে কাঁদছো কেন? কিসের এত কষ্ট তোমার? বৃদ্ধা চোখের জল মুছতে মুছতে মুখ তুলে তাকালেন। কিন্তু তিনি তখনো বুঝতে পারেননি তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা [মিউজিক] এই সাধারণ ছোট মেয়েটি আর কেউ নন। স্বয়ং বর্ষানার রাজকুমারী যার জন্য তিনি সারাদিন ধরে একমুঠো চালের আকুতি জানিয়েছিলেন। মেয়েটির চোখ দুটো দিয়ে যেন করুণা আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত আলো ঠিকরে বের হচ্ছিল। সেই আলোয় বৃদ্ধার হৃদয়ের সমস্ত ক্লান্তি আর কষ্ট যেন এক
00:29:57
নিমেশে দূর হয়ে গেল। বালিকাটি অত্যন্ত মমতায় বৃদ্ধার পাশে সিঁড়ির ধুলোর উপর বসে পড়লেন। ধনী মানুষদের দামি শাড়ির ছোঁয়া থেকে যে ধুলোকে সবাই বাঁচিয়ে চলছিল সেই ধুলোয় বসে পড়ে বালিকাটি নিজের কোমল দুটি হাত দিয়ে বৃদ্ধার ছড়ে যাওয়া হাঁটু আর ধুলো মাখা হাত দুটো পরম আদরে মুছে দিলেন। তারপর অতি [মিউজিক] মিষ্টি গলায় বললেন, ওমা তুমি এভাবে কাঁদছো কেন? এই সুন্দর দিনে বর্ষানার সবাই তো আনন্দে ভাসছে আর তুমি সিঁড়ির ধুলোয় বসে চোখের জল ফেলছো কি হয়েছে আমাকে বলবে না বৃদ্ধা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায়
00:30:33
বললেন কি বলবো রে মা আজ যে আমাদের আদরীয় রাধারানীর জন্মদিন সারা বর্ষানার মানুষ তাকে কত কি উপহার দিচ্ছে আমি এক কাঙাল বুড়ি আমার যে তাকে দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না সারাদিন গ্রামে ঘুরে ঘুরে দ্বারে দ্বারে হাত পেতে কেবল এই এক মুঠো চাল জোগাড় করেছিলাম ভেবেছিলাম নিজের হাতে রাধারানীকে এই চালের প্রসাদ নিবেদন করব। কিন্তু মন্দিরের প্রহরীরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। মাটির পাত্রটা ভেঙে আমার সারাদিনের উপার্জিত চালগুলো ওই সিঁড়ির ধুলোয় মিশে গেল রে। আমি যে রাধারানীকে আর কিছুই দিতে পারলাম না। কথাগুলো বলতে বলতে
00:31:10
বৃদ্ধা আবার অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। বালিকাটি মৃদু হেসে বৃদ্ধার হাত দুটি নিজের কোমল হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরলেন। তারপর মিষ্টি গলায় বললেন, কে বলেছে তোমার চাল নষ্ট হয়ে গেছে মা? এইতো দেখো সিঁড়ির ধুলোর মধ্যে কত সুন্দর চালের দানা পড়ে আছে। এই বলে সেই ছোট বালিকাটি নিজে হাঁটু গেড়ে সিঁড়ির উপর বসে পড়লেন। তারপর নিজের প্রদীপের মত সুন্দর আর কোমল আঙ্গুল দিয়ে সিঁড়ির ধুলো ও পাথরের কঙ্করের ভেতর থেকে বেছে বেছে চালের দানাগুলো কুড়াতে শুরু করলেন। একটি একটি করে চালের দানা তুলে নিয়ে তিনি নিজের ছোট্ট হাতের তালুতে
00:31:50
জমা করতে লাগলেন। বৃদ্ধা অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে লাগলেন। বালিকাটির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো এই ছোট মেয়েটির প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক অলৌকিক ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। বেশ কিছু চালের দানা হাতে জমা হতেই বালিকাটি বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বললেন, দেখো মা কত চাল উঠে এসেছে। তোমার ভালোবাসার চাল কি কখনো হারিয়ে যেতে পারে? নাও এই চাল আমাকে খাইয়ে দাও। আমি খুব ক্ষুধার্ত। আজ সকাল থেকে কিচ্ছু খায়নি। বৃদ্ধা চমকে উঠে বললেন, কি বলছিস রে মা? ওগুলো যে সিঁড়ির নোংরা ধুলবালি মাখা কাঁচা চাল ওগুলো কি খাওয়া যায়? তোর পেটে ব্যথা করবে রে মা।
00:32:35
কিন্তু বালিকাটি কোন কথা শুনলেন না। তিনি নিজেই বৃদ্ধার হাতটা ধরে নিজের তালুতে রাখা সেই ধুলো মাখা কাঁচা চালের দানাগুলো তুলে নিলেন। তারপর কোন দ্বিধা না করে অত্যন্ত আদরের সঙ্গে সেই কাঁচা চালের কণাগুলো নিজের মুখে তুলে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে চিবতে লাগলেন। কাঁচা চাল মুখে দিতেই বালিকাটির দুই চোখ আনন্দের জলে ভরে উঠলো। তিনি চিবতে চিবতে [মিউজিক] বললেন, আহা মা এত স্বাদের প্রসাদ আমি জীবনে কখনো খাইনি। মন্দিরের ভেতরে সোনার থালায় সাজানো 56 ভোগে যে স্বাদ নেই তোমার এই অশ্রুশিক্ত কাঁচা চালের দানায় তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি স্বাদ রয়েছে। তোমার ভালোবাসাই যে
00:33:20
আমার পেট ভরিয়ে দিল মা। সাধারণ এক ছোট মেয়েকে এমন পরম তৃপ্তি ও আনন্দের সঙ্গে কাঁচা চাল খেতে দেখে বৃদ্ধাস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েন। তার বুকের ভেতরে এক অজানা শিহরণ খেলে গেল। তিনি ভাবতেই পারলেন না সিঁড়ির ধুলোয় পড়ে থাকা অপমানিত এক মুঠো চাল কিভাবে এক অচেনা বালিকার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু প্রসাদ হয়ে উঠতে পারে। সেই সাধারণ বালিকা যখন পরম তৃপ্তিতে ধুলো মাখা কাঁচা চাল চিবিয়ে নিচ্ছিলেন ঠিক তখনই এক পরম অলৌকিক পরিবর্তন ঘটা শুরু হল বাতাস থমকে গেল চারপাশের ঢাকঢোল আর খোল করতালের শব্দ যেন এক নিমেশে স্তব্ধ হয়ে গেল আতাশ থেকে ঝরে
00:34:06
পড়তে লাগলো এক অন্যরকম মিষ্টি সুবাস যা মন্দিরের কৃত্রিম ধূপধুনর গন্ধকে হারিয়ে দিল বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন সেই বালিকার দিকে তিনি দেখলেন ছোট মেয়েটির গা থেকে হঠাৎ এক অলৌকিক ও অপরূপ জ্যোতি ঠিকরে বেরোতে শুরু করেছে। সেই জ্যোতি এতই উজ্জ্বল আর শান্ত যে তার রাতের অন্ধকারের সিঁড়িকে তো বটেই পুরো বর্ষানা পাহাড়কে এক স্বর্গীয় আলোয়ে ভাসিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে বালিকার সেই সাধারণ সুতোর পোশাক বদলে গেল এক মহিমান্বিত দিব্য >> [মিউজিক] >> রেশমী বস্ত্রে। তার কপালে ফুটে উঠলো চন্দনের দিব্য তিলক। মাথায় সুশোভিত হলো
00:34:46
মুক্ত ও রত্নজড়িত অপরূপ মুকুট আর চরণে নুপুরের মিষ্টি শব্দ বেজে উঠল। বালিকার সেই কোমল রূপ এক নিমেষে পরমেশ্বরী শ্রী রাধার স্বয়ং দিব্য মূর্তিতে রূপান্তরিত হল। বৃদ্ধা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে হাত দুটো জোর করলেন। তার সামনে সায়ং বর্ষানার রাজকুমারী জগতের মাতা শ্রী রাধা দাঁড়িয়ে আছেন। যার এক ঝলক দর্শনের জন্য বড় বড় মুনিঋষি হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেন। সেই পরমেশ্বরী আজ এক কাঙাল বুড়ির ধুলোমাখা কাঁচা চাল খেয়ে তারই পাশে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। শ্রী রাধা তার পরম রূপ দর্শন করিয়ে অভয়
00:35:31
দিয়ে মিষ্টি গলায় বললেন ও মা তুমি চোখ মেলো দেখো তোমার আদরীয় রাধারানী তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তুমি কেন ভাবলে তোমার দেওয়ার কিছু নেই তুমি তো আমাকে তোমার সারা জীবনের জমানো অগাধ ভক্তি প্রেম আর চোখের জল উপহার দিলে মন্দিরের ভেতরে সোনার থালায় বড় বড় অহংকারী ভক্তরা যা চড়িয়েছে তাতে ধন সম্পদ ছিল সত্যি কিন্তু আমার প্রতি এমন নিষ্কাম ভালোবাসা [মিউজিক] ছিল না। আজ তোমার একমুঠো চাল খেয়েই আমার পরম তৃপ্তি হয়েছে। মা। শ্রী রাধার সেই করুণাময় রূপ আর বাণী শুনে বৃদ্ধার চোখের জল বাঁধ মানলো না। তিনি অঝোর ধারায়
00:36:11
কাঁদতে কাঁদতে শ্রী রাধার চরণে লুটিয়ে পড়লেন। কাঁদতে থাকা হাত দিয়ে দেবীর রূপময় চরণ দুটো চেপে ধরে আবেগ ভরা গলায় বললেন, হে করুণাময়ী রাধে, হে আমার আদরীয়, আমি কত না ভুল করেছি রে মা, তোকে চিনতে পারিনি। তোকে আমি সিঁড়ির নোংরা ধুলো মাখা চাল খাইয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করো মা আমাকে ক্ষমা করো। শ্রী রাধা নিচু হয়ে অত্যন্ত ভালোবাসায় বৃদ্ধার হাত ধরে তাকে ধুলো থেকে তুলে দাঁড় করালেন। তারপর নিজের দিব্য হাতে বৃদ্ধার চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, মা ভক্তের অশ্রু আর পরম ভালোবাসায় নিবেদিত বস্তু কখনো নোংরা হতে পারে না। জগতে ধন সম্পদ বা রাজকীয় আরম্বর
00:36:53
দিয়ে আমাকে কেনা যায় না। আমি তো কেবল ভক্তির কাঙাল। যে আমাকে ভালোবেসে এক ফোঁটা চোখের জল দেয় আমি তার কাছে চিরকালের জন্য বিক্রি হয়ে যাই। শ্রী রাধার স্পর্শে বৃদ্ধার জরাজীর্ণ শরীরের সমস্ত রোগ, যন্ত্রণা, ক্লান্তি আর পেটের ক্ষুধা এক মুহূর্তে উবে গেল। তার হৃদয় ভরে উঠলো এক অলৌকিক আনন্দ আর শান্তিতে। শ্রী রাধা বৃদ্ধাকে নিজের পরমধামে স্থান পাওয়ার আশীর্বাদ প্রদান করলেন এবং বর্ষানার ইতিহাসে এক কাঙ্গাল ভক্তের ভক্তিকে [মিউজিক] চিরকালের জন্য অমর করে দিলেন এবং সেই অলৌকিক দিব্য জ্যোতি আর সুবাস যখন পুরো বর্ষানা পাহাড় জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল
00:37:33
তখন মন্দিরের ভেতরের পরিবেশ এক নিমেষে বদলে গেল প্রদীপগুলোর আলো যেন এক অচেনা শান্তিতে জলজল করে উঠলো সুবর্ণ থালায় সাজিয়ে রাখা [মিউজিক] 24 ব্যঞ্জন আর 56 ভোগের দিকে তাকাতেই পুরোহিত মহাশয় আর ধনী ভক্তরা বিশ্বয়ে হতবাক হয়ে গেলেন। সব কটি থালার খাবার যেমন ছিল তেমনই পড়ে রয়েছে। তার একটি দানাও শ্রীরাধা গ্রহণ করেননি। ঠিক সেই সময় মন্দিরের ত্বরণের দিক থেকে এক অলৌকিক আলো আসতে দেখে প্রহরীরা, রাজবাড়ির কর্মকর্তারা এবং বড় বড় ধনকুবের শ্রেষ্ঠীরা উৎসুক হয়ে দৌড়ে বাইরে এলেন। বাইরে এসে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই তাদের চোখ কপালে
00:38:12
উঠলো। তারা দেখলেন কিছুক্ষণ আগে যাকে কাঙ্গাল ও ভিখারী বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই বৃদ্ধার সামনে স্বয়ং বর্ষানার রাজকুমারী পরমেশ্বরী দেবী শ্রী রাধা এক অপরূপ দিব্য রূপে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দেবীর শ্রীমুখ থেকে ঝরে পড়ছে এক অনাবিল হাসি। আর তিনি পরম আদরে বৃদ্ধার ধুলোমাখা হাত দুটি নিজের চরণে চেপে ধরে আছেন। দেবীর চরণ ছুঁয়ে থাকা সেই সিঁড়ির ধুলো আর নোংরা বালিগুলো এক মুহূর্তে সোনা আর রত্নের মত জলজল করে উঠছে। এই দৃশ্য দেখে অহংকারী প্রহরীদের হাতের লাঠি মাটিতে খসে পড়ল। ধনী সৃষ্টিদের হাতের সোনার থালা আর দামি রেশমী কাপড়ের তোরজোড় এক নিমেশের
00:38:53
তুচ্ছ আর অর্থহীন মনে হলো। যে প্রহরীরা বৃদ্ধাকে সজরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল তারা ভয়ে আর লজ্জায় কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। পরমেশ্বরী শ্রী রাধার করুণা আর এক নিঃশ্ব ভক্তের ভালোবাসার এই অলৌকিক রূপ দেখে সবার অহংকার যেন এক মুহূর্তে চুরমার হয়ে ধুলোয়ে মিশে গেল। পুরোহিত মহাশয় আর ভক্তরা কাঁদতে কাঁদতে শ্রী রাধার চরণে আছড়ে পড়লেন। তারা হাত জোড় করে মিনতি করতে লাগলেন। হে করুণাময়ী রাধে আমাদের ক্ষমা করো মা। আমরা ধনের অহংকারে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম সোনা দানা আর সুস্বাধু খাবারের
00:39:30
প্রদর্শনী করেই বুঝি তোমায় পাওয়া যায়। আমরা চিনতে পারিনি যে তোমার আসল নিবাস রাজকীয় আরম্বরে নয় ভক্তের নিষ্পাপ আর অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে। শ্রী রাধা গম্ভীর অথচ অত্যন্ত করুণাময় স্বরে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন হে বর্ষানাবাসী মনে রেখো সোনাদানা দামি বস্ত্র কিংবা রূপের অহংকার দিয়ে পরমেশ্বরকে কখনো লাভ করা যায় না যে ব্যক্তি বাহ্যিক দেখনদারী আর ধনের বড়াই করে তার হাজারো ব্যঞ্জনও আমার কাছে বিষের সমান। আর যে মানুষ নিঃস্ব হয়েও হৃদয়ের সমস্ত প্রেম আর এক ফোঁটা চোখের জল নিয়ে আমার কাছে আসে তার দেওয়া এক মুঠো কাঁচা
00:40:10
চালই আমার কাছে স্বর্গীয় প্রসাদ হয়ে ওঠে। আমি কোন ধনসম্পদের ভুগি নই। আমি কেবল এক নিষ্ঠ ভক্তির কাঙাল। এই কথা বলে মাতা শ্রী রাধা সেই পরম আলোকের মধ্যে ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হলেন। কিন্তু বর্ষানার সিঁড়িতে রেখে গেলেন এক চিরন্তন শিক্ষা ও পরম ভক্তির স্মৃতি। বৃদ্ধাভক্তিটি পরম শান্তিতে দুই চোখ বন্ধ করলেন। শ্রী রাধার স্পর্শ ও দর্শনে তার জন্ম জন্মান্তরের সমস্ত দুঃখ ঘুচে গেল। তার হৃদয় কৃষ্ণ প্রেমে ও রাধাভাবে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। মন্দিরের প্রহরীরা ও ধনী শ্রেষ্ঠীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অশ্রু সজল চোখে সেই বৃদ্ধার চরণ স্পর্শ করে ক্ষমা চাইলেন।
00:41:03
যে সিঁড়িতে বৃদ্ধার চাল ছড়িয়ে পড়েছিল সবাই সেই সিঁড়ির ধুলো মাথায় ঠেকাতে লাগলেন। এই পরম কাহিনী আমাদের শেখায় যে রাধারানীকে পেতে কোন সোনা-দানা বা বড় বড় উপধোকনের প্রয়োজন হয় না। মনকে অহংকার মুক্ত করে ভক্তি ও ভালোবাসায় এক ফোঁটা চোখের জল ফেললেই শ্রী রাধা তার ভক্তের দরবারে নিজে নেমে আসেন। যে মানুষ নিষ্ঠা ভরে এই রাধা অষ্টমীর ব্রতকথা শ্রবণ করে ও শ্রী রাধার চরণে নিজের অহংকার সমর্পণ করে সে ইহলোকে পরম শান্তি এবং পরম ধামে স্থান লাভ করে। ভক্তগণ এবার শুনুন রাধারানীর আবির্ভাবের সেই অলৌকিক কাহিনী। এক সময়কার
00:41:52
কথা শ্রীকৃষ্ণ ও দেবী রাধা এক পরম নির্জন পবিত্র নিকুঞ্জ বনে অবস্থান করছিলেন। চারিদিকে পুষ্পের [মিউজিক] সুবাস যমুনার মৃদুমন্দ বাতাস আর পক্ষীকূলের মধুর কুজন। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলেন শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় সখা তথা পরম ভক্ত শ্রীধম। শ্রীধম ছিলেন কৃষ্ণের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ অনুচর। কিন্তু নিকুঞ্জ বনে প্রবেশের সময় দেবী রাধিকার এক সখী শ্রীধামকে দ্বারে আটকে দিলেন। সখী সস্নেহে জানালেন যে এই মুহূর্তে নিকুঞ্জে প্রবেশ নিষেধ। কারণ প্রভু শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানী এক একান্ত প্রেমালাভ ও ধ্যানে মগ্ন আছেন। কিন্তু শ্রীধম ছিলেন সরল ও এক গুয়ে
00:42:35
স্বভাবের ভক্ত। প্রভুর দর্শনের ব্যাকুলতায় তিনি সেই নিষেধ মানতে চাইলেন না। দারপাল সখীর সাথে তার সামান্য তর্কাতর্কি শুরু হলো। এক পর্যায়ে শ্রীধম রাধারানীর অনুমতি ছাড়াই সরাসরি সেই নিকুঞ্জ কাননে প্রবেশ করে ফেললেন। [মিউজিক] নিকুঞ্জে প্রবেশ করতেই দেবী রাধিকা শ্রীধমকে সেখানে দেখে সামান্য অসন্তুষ্ট হলেন। গোলকের অপ্রাকৃত মর্যাদার খাতিরে এবং লীলার খাতিরে তিনি শ্রীধমকে বললেন, শ্রীধম তুমি আমার অনুমতি ছাড়া এই একান্ত প্রেমাঙ্গনে প্রবেশ করেছ এবং সখীদের আদেশ অমান্য করেছ। তুমি তোমার এই উদ্ধত আচরণ ও ভক্তি মর্যাদা লঙ্ঘনের
00:43:14
অপরাধে গোলকধাম থেকে বিচ্যুত হবে। তোমাকে মর্তলোকে গিয়ে সাধারণ মানব পরিবারে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এই কঠোর কথা শুনে শ্রীধামের হৃদয় কেঁপে উঠলো। পরম প্রভুর ধাম ছেড়ে মর্তের দুঃখ কষ্টময় জীবনে [মিউজিক] জন্ম নেওয়া একজন বৈষ্ণবের জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি। তবে শ্রীধামও ছিলেন গোলকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তি। দেবী রাধার এই বাক্যে ক্ষুব্ধ ও ব্যাকুল হয়ে শ্রীধাম বলে উঠলেন দেবী আপনি কৃষ্ণের পরম প্রিয় প্রাণা হতে পারেন কিন্তু অহংকার বসত যে সাপ আপনি আমাকে দিলেন তার ফল আপনাকেও ভোগ করতে হবে আপনিও এই পরমধাম গোলক ত্যাগ করে
00:43:53
মর্তলোকে মায়াবতী গোপকন্যা হিসেবে জন্ম নেবেন 100 বছর ধরে আপনি আপনার প্রাণপ্রিয় শ্রীকৃষ্ণের বিরহ সহ্য করবেন মর্তলোকে শ্রীকৃষ্ণ আপনার কাছেই থাকবেন অথচ আপনি তার পরম [মিউজিক] সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে বিরহ বেদনায় দিন কাটাবেন। এই অভিশাপের কথা শোনা মাত্র সম্পূর্ণ গোলকধামে যেন এক নীরবতার ছায়া নেমে এল। পবনদেব স্তব্ধ হয়ে গেলেন। যমুনার জল থমকে দাঁড়ালো। রাধারানী নিজে দেবী আধ্যাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও এই অভিশাপকে হাসি মুখে মাথা পেতে নিলেন। কারণ তিনি জানতেন এটি কোন সাধারণ ঘটনা নয়। এটি আসলে পৃথিবীর ভার হরণ করার
00:44:31
এবং মর্তবাসীকে পরম ভক্তির রস আস্বাদন করানোর এক দিব্য চক্রান্ত বা কৃষ্ণলীলা। যখন শ্রীধাম নিজের হোলের গুরুত্ব বুঝতে পারলেন তখন তিনি অনুতাপে ভেঙে পড়লেন [মিউজিক] এবং শ্রীকৃষ্ণের চরণে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু সাপের বিধান তো পরিবর্তন করা যায় না। তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ম্লান হেসে দেবী রাধিকাকে কাছে ডাকলেন। শ্রীকৃষ্ণ রাধার হাত দুটি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে পরম স্নেহে বললেন, প্রিয়ে মন খারাপ করো না। শ্রীধমের এই সাপ আসলে মর্তলোকের কোটি কোটি জীবের উদ্ধারের [মিউজিক] উপায়। আমি আর তুমি কখনো আলাদা
00:45:07
হতে পারি না। তুমি আমার শক্তি আর আমি তোমার শক্তিমত্তা। দেহে প্রাণ যেমন মিশে থাকে আমরাও তেমনি এক ও অভিন্ন। শ্রীকৃষ্ণ দেবী রাধাকে অশ্বস্ত করে আরো বলবেন, তুমি মর্তলোকে বৃষভানু রাজার কন্যা হিসেবে অবতীর্ণ হবে। কিন্তু তোমার জন্ম সাধারণ মানুষের মত কোন মাতৃগর্ভ থেকে হবে না। তুমি হবে অজনীজা, পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক ও পরম ঐশ্বরিক। আমি নিজে ধরাধামে শ্রীকৃষ্ণ রূপে অবতার গ্রহণ করব। তুমি ও আমি মর্তের বুকে এমন এক প্রেমলীলা ও ভক্তিগাথা রচনা করব যা যুগ যুগ ধরে মানুষ স্মরণ করবে। আমাদের এই বিরহ ও মিলন গাথা শুনে মর্তের পাপী তাপী
00:45:52
জীব মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম আশ্বাস ও প্রেমময় বাণী শুনে দেবী রাধার হৃদয়ের সমস্ত সংশয় ও মেঘ কেটে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন গোলকের এই বিরহ সংকল্প আসলে মর্তবাসীকে কৃপাদানের এক মহাশুভ সূচনা। পরমধাম গোলক থেকে মর্তের পানে নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হলেন জগৎজননী দেবী রাধিকা। গোলকধামে যখন মর্তে অবতরণের পথ তৈরি হচ্ছিল, তখন মর্তলোকের ব্রজমন্ডলে চলছিল এক পরম পবিত্র প্রস্তুতি। সেই সময় ব্রজভূমির অন্তর্গত রাওয়াল ও বর্ষা অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন পরম ধার্মিক ও দয়ালু রাজা বৃষভানু। তিনি কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না বরং পরমেশ্বর ভগবানের একজন
00:46:42
পরম অনুগত ভক্তও ছিলেন। তার ধর্মপত্নী রানী কীর্তিদা ছিলেন অত্যন্ত শান্ত পতিব্রতা এবং দয়াময়ী নারী। রাজা বৃষভানু ও রানী কীর্তিদার রাজত্বে কোন কিছুর অভাব ছিল না। ধন-ধান্য, গোধন, সম্মান আর প্রজাভক্তিতে তাদের সংসার কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। কিন্তু এত সুখের মধ্যেও তাদের দুইজনের মনে এক গভীর দুঃখ সারাক্ষণ কাটার মতো বিধত। রাজপ্রাসাদের এত বড় ঐশ্বর্য অথচ তা উপভোগ করার মতো কিংবা সেই বিশাল রাজসিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে কোল আলো করে কোন সন্তান ছিল না। সন্তানহীনতার এই নিঃশব্দ বেদনা রাজা ও রানীকে দিন-রাত দগ্ধ করত। একদিন সন্ধ্যার
00:47:31
পর প্রাসাদের নির্জন অঙ্গনে বসে রাজা বৃষভানু গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। রানী কীর্তিদা প্রদীপ হাতে সেখানে এসে দন্ডায়মান হলেন। রাজাকে অতটা বিষন্ন দেখে তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, মহারাজ আমাদের এত বড় রাজ্য, এত গোধন, এত ধন-সম্পদ সবই তো রয়েছে। কিন্তু আমাদের পর এই বিশাল সম্পত্তি কে রক্ষা করবে? কাকে আমরা স্নেহের পরম সুধা দান করব? এক ফোটা সন্তানের হাসি শোনার জন্য যে আমার মন সারাক্ষণ কেঁদে ওঠে। রানীর কথা শুনে রাজা বৃষভানুর চোখ দুটি জলে ভরে উঠলো। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দেবী ধনসম্পদ মানবের চেষ্টায় মিলতে পারে। কিন্তু
00:48:16
সন্তান তো পরমেশ্বরের অশেষ কৃপা ছাড়া মেলে না। আমাদের হয়তো কোন জন্মান্তরের পাপ রয়েছে। তাই আজ আমরা এই পূণ্য লাভ করতে পারছি না। তবে আমাদের ভেঙে পড়লে [মিউজিক] চলবে না। যিনি পরম নিয়ন্ত্রক সেই মহাদেবের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। সেই রাতেই রাজা বৃষভানু ও রানী কীর্তিদা স্থির করলেন। তারা সব রাজকীয় ভোগবিলাস ত্যাগ করে কঠোর তপস্যা ও ব্রত পালন করবেন। পরদিন থেকেই শুরু হলো তাদের চরম কৃছ সাধন। রাজপ্রাসাদের সুকমল সজ্যা ত্যাগ করে তারা ভূমিতে স্বয়ন করতে লাগলেন। সুস্বাধু রাজকীয় খাবার ছেড়ে
00:48:57
কেবল ফলমূল আর জল গ্রহণ করে নির্জন এক স্থানে পরম শিবের তপস্যায় নিমগ্ন হলেন। দিন যায়, মাস যায়, ঋতুর পর ঋতু পরিবর্তিত হতে থাকে। গ্রীশের প্রখর তাপ, বর্ষার মুসলধারায় বৃষ্টি আর শীতের কনকনে ঠান্ডা কোন কিছুই তাদের তপস্যা থেকে টলাতে পারল না। রাজা ও রানী এক মনে কেবল পরমেশ্বর মহাদেবের ধ্যান করে চললেন। তার এই অবিচল ভক্তি, ধৈর্য ও আত্মত্যাগে মর্তলোক থেকে স্বর্গলোক পর্যন্ত থমকে দাঁড়ালো। অবশেষে রাজা ও রানীর এই নিষ্কাম নিষ্ঠায় মহাদেব তুষ্ট হলেন। একদিন গভীর রাতে যখন চারদিক নিঝুম ও শান্ত তখন এক পরম জ্যোতিতে ভরে উঠলো তাদের ধ্যান কক্ষ। সেই
00:49:43
জ্যোতির মধ্য থেকে স্বয়ং মহাদেব আবির্ভূত হলেন। মহাদেবের সেই প্রশান্ত ও দিব্য রূপ দেখে রাজা ও রানী ভীতি ও ভক্তিতে বিগলিত হয়ে তার চরণে লুটিয়ে পড়লেন। মহাদেব মৃদু হেসে পরম করুণা ভরে বললেন, হে রাজস্বী বৃষভানু, হে পুণ্যবতী কীর্তিদা, তোমাদের এই কঠোর তপস্যা ও নিষ্কাম [মিউজিক] ভক্তিতে আমি পরম প্রীত হয়েছি। অকাতরে নিজের সুখ ত্যাগ করে তোমরা যে সাধনা করেছ তা [মিউজিক] মর্তলোকে দুর্লভ। ওঠো তোমাদের মনের যা গোপন প্রার্থনা তা ব্যক্ত করো। আমি তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করব। রাজা বৃষভানু হাত জোড় করে কাঁপানো কন্ঠে বললেন, হে প্রভু দেবাধিদেব, যদি
00:50:30
আমাদের তপস্যায় আপনি সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের এই নিঃসন্তানের কলঙ্ক মুছে দিন। আমাদের কোল আলো করে এমন একটি সন্তান দান করুন যে আমাদের জীবনে পরম শান্তি ও আনন্দ ফিরিয়ে আনবে। মহাদেব তখন স্মিত হেসে এমন এক কথা বললেন যা শুনে রাজা ও রানীর শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। মহাদেব বললেন রাজা বৃশভানু শোনো সাধারণ কোন মানব শিশু তোমাদের ঘরে [মিউজিক] আসবে না স্বয়ং বৈকুণ্ঠ ও গোলকের মূল আদ্যশক্তি পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পরম প্রিয়া দেবী রাধাই তোমাদের [মিউজিক] কন্যা হিসেবে মর্তে অবতরণ করবেন তিনি গর্ভজাত হবেন না বরং এক
00:51:12
পরম অলৌকিক উপায়ে তোমরা তাকে লাভ করবে তোমরা হবে ধন্য আর তোমাদের ঘর হবে সমগ্র ব্রহ্মান্ডের পূজনীয় এই মহাবর দান করে মহাদেব অন্তর্হিত হলেন। রাজা বৃশ্বভানু ও রানী কীর্তিদার চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মহাদেবের পরম বর লাভের পর রাজা বৃষ্ভানু ও রানী কীর্তিদার হৃদয়ে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল তা দেখতে দেখতে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করল। সময় তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলল। প্রকৃতির বুক জুড়ে নামল সুন্দর ভাদ্র মাস। আকাশ তখন একদম পরিষ্কার। মেঘ মুক্ত ও নির্মল। চারপাশের গাছপালা যেন নতুন সুবাসিত ফুলে ফুলে ভরে উঠলো। যমুনার জল শান্ত অথচ এক
00:52:00
পরম আনন্দে উথলে উঠছিল। সেদিন ছিল ভাদ্র মাসের অত্যন্ত পবিত্র শুক্লা অষ্টমী তিথি। নক্ষত্র ছিল শুভ অনুরাধা। বাতাস জুড়ে এক অজানা সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। যা ব্রজভূমির সাধারণ মানুষকেও এক অপূর্ব আনন্দে ভরিয়ে তুলছিল। কিন্তু কেউ তখনো বুঝতে পারছিল না কেন আজকের এই সকালটি অন্য সব দিনের চেয়ে এত আলাদা এত আলোকময়। সকালবেলা রাজা বৃষভানু প্রতিদিনের মত যমুনার তীরে স্নান ও জপ ধ্যান করার জন্য রওনা হলেন। তার মন আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরেছিল। যমুনার ঘাটে পৌঁছে তিনি যখন পবিত্র জলে নেমে ধ্যানে বসতে যাবেন ঠিক তখনই এক অভূতপূর্ব আলো তার চোখে
00:52:46
এসে পড়ল। যমুনার শান্ত জলের মাঝখানে এক পরম উজ্জ্বল জ্যোতি চমকে উঠলো। সেই আলো সাধারণ কোন সূর্যের আলো ছিল না। তা ছিল কোটি সূর্যের চেয়েও শান্ত অথচ পরম পবিত্র এক মহা জাগতিক দুতি। রাজা বৃষভানু বিশ্বয় স্তব্ধ হয়ে জল থেকে চোখ তুলে তাকালেন। তিনি দেখলেন যমুনার নীল জলের উপর ভেসে রয়েছে এক বিরাট অতি সুন্দর সুবর্ণ পদ্ব। অর্থাৎ এক মায়াবী স্বর্ণপদ্য। সেই পদ্বের পাপড়িগুলো যেন স্বর্গের কোন কারিগরের নিজ হাতে তৈরি। আর সেই স্বর্ণপদ্বের ঠিক মাঝখানে শুয়ে রয়েছে এক পরম সুন্দরী দিব্য কান্তিময়ী নবজাতিকা কন্যাপুত্রী।
00:53:31
শিশুকন্যাটির গায়ের রং যেন গলিত সোনার মত উজ্জ্বল। তার ছোট ছোট হাত পা পদ্বের পাপড়ির মতোই কোমল। পুরো যমুনা নদী আর চারপাশের আকাশ সেই শিশুর গায়ের পরম আলোতে ঝলমল করে উঠছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো শিশুকন্যাটি সাধারণ মানুষের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়নি। সে ছিল একদম অজনীজা। অর্থাৎ সতস্ফুর্তভাবে সেই সুবর্ণ পদ্বের উপর আবির্ভূত এক পরম দিব্য শক্তি। এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে রাজা বৃষভানুর বুক আনন্দে ও ভক্তিতে কেঁপে উঠল। মহাদেবের সেই বরদানের কথা এক মুহূর্তে তার মনে ভেসে উঠলো। তিনি আর একটুও দেরি না করে ব্যাকুল হৃদয়ে যমুনার জলের গভীরে এগিয়ে
00:54:18
গেলেন। পরম সাবধানে অতি স্নেহে সেই স্বর্ণপদ্ব থেকে শিশুকন্যাটিকে নিজের কোলে তুলে নিলেন। যেমনি শিশুকন্যাটি রাজা বৃষভানুরানুর বুকে স্পর্শ করল। অমনি রাজার মনে হলো তার জন্মের সমস্ত পাপ জীবনের সব দুঃখ কষ্ট এক নিমেশে ধুয়ে মুছে ছাই হয়ে গেল। আনন্দে তার দু চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি পরম প্রেমে শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন হে জগৎ জননী হে পরমেশ্বরী আজ আমার সব সাধনা সার্থক হলো। আমার খা করা শূন্য ঘর আজ ধন্য হয়ে গেল। আকাশ থেকে তখন দেবতারা আনন্দ ধ্বনি করে উঠলেন। স্বর্গের পারিজাত পুষ্পের বৃষ্টি ঝরে পড়তে লাগলো ব্রজভূমির
00:55:06
বুকে। গন্ধর্বেরা মধুর গান গাইতে লাগলেন। আর অপসরাগণ নৃত্য শুরু করলেন। ধরণী যেন তার সবচেয়ে মহামূল্যবান রত্নটিকে খুঁজে পেল। রাজা বৃষভানু কন্যাকে বুকে জড়িয়ে দ্রুত রাজপ্রাসাদের দিকে ছুটে চললেন। রাজপ্রাসাদে রানী কীর্তিদা তখন ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। রাজা যখন সেই জ্যোতির্ময়ী শিশুকন্যাকে এনে রানীর কোলে দিলেন রানী কীর্তিদার আনন্দের কোন সীমা রইল না। তিনি শিশুকন্যাকে বুকে চেপে ধরে পরম মাতৃস্নেহে চোখের জলে ভেসে গেলেন। নিঃসন্তানের কপালে আজ প্রদীপের মত জ্বলে উঠেছে পরম ধামের আলো। রাজপ্রাসাদের আঙ্গিনায় তখন আনন্দের জোয়ার ভেসে চলেছে।
00:55:49
গোপরাজ বৃষভানুর ঘরে স্বয়ং লক্ষ্মীপা কন্যার আগমন ঘটেছে এই খবর রাওয়াল ও বর্ষানার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়তে একটুও সময় লাগলো না। চারদিক থেকে গোপ গোপী প্রজা ও গুণীজনেরা ছুটে আসতে লাগলেন সেই পরম রূপবতী কন্যাকে এক নজর দেখার জন্য। সারা গ্রাম ফুল দিয়ে সাজানো হলো। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানো হলো। আর পথ ঘাটে সুগন্ধি জল ছেটানো হলো। শাখের ধ্বনি, ঢাকের আওয়াজ আর ঢোলের তালে তালে পুরো ব্রজভূমি যেন এক মহা উৎসবের নগরীতে পরিণত হলো। প্রজা আর গোপেরা উপহার হাতে নিয়ে প্রাসাদে ভিড় জমালো। রাজা বৃষভানু আনন্দের সাগরে ভাজতে ভাজতে অকাতরে সোনা
00:56:34
দানা বস্ত্র আর দুধ মাখন দান করতে লাগলেন। নিঃশ্ব প্রজা থেকে শুরু করে যাচক কেউ সেদিন খালি হাতে ফিরলো না। এমন সময় রাজপ্রাসাদে আগমন ঘটলো পরম শাস্ত্রজ্ঞ ও কুলুগুরু ঋষি গর্গের। মহামতী গর্গমুনি দ্বারে আসা মাত্রই রাজা বৃষভানু অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাকে প্রণাম জানিয়ে পরম আদরে অভ্যর্থনা জানালেন। ঋষি গর্গকে রাজসিংহাসনের পাশে পরম পবিত্র আসনে বসানো হলো। রানী কীর্তিদা অতি ভালোবাসায় ও সাবধানে সেই পরম জ্যোতির্ময়ী শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে ঋষির সামনে এসে [মিউজিক] দাঁড়ালেন। ঋষি গর্গমুনি শিশুকন্যার দিকে তাকানো মাত্রই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ
00:57:18
হয়ে গেলেন। তার চোখ দুটি পরম বিশ্বয়ে বড় বড় হয়ে উঠল। অন্তরদৃষ্টি দিয়ে তিনি চিনে নিলেন এই শিশু কোন সাধারণ মানব সন্তান নয়। এ হলো বৈকুন্ঠ ও গোলকের মূল আদ্যশক্তি। পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পরম প্রিয়া আহলাদিনী শক্তি দেবী রাধিকা। ঋষি গর্গ ধ্যানে চোখ বুঝে সেই পরম শক্তির রূপ প্রত্যক্ষ করলেন। ধ্যান শেষে তিনি স্মৃত হেসে বললেন, হে মহারাজ বৃষভানু হে পূণ্যবতী কীর্তিদা তোমরা অতি ভাগ্যবতী ও পূণ্যবান। এই কন্যাপুত্রী সাধারণ কেউ নয়। ইনি হলেন সমস্ত শুভ ও সমৃদ্ধির মূল আধার। শাস্ত্র মতে যার কৃপা ছাড়া পরমেশ্বরের ভক্তি মেলে না ইনি সেই মহাশক্তি। রা শব্দে
00:58:05
পরম প্রাপ্তি আর ধা শব্দে মোক্ষ নির্দেশ করে। তাই এই অলৌকিক কন্যার নাম রাখা হলো রাধা। রাধা নাম শোনা মাত্রই যেন রাজপ্রাসাদের আকাশে বাতাসে এক পরম সুবাসিত সুর তরঙ্গায়িত হয়ে উঠলো। সবাই আনন্দে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠলো জয় রাধারানীর জয় জয় ব্রজেশ্বরী রাধার জয় কিন্তু এই পরম আনন্দের মাঝেও এক গভীর উদ্বেগের মেঘ নেমে এল নামকরণের শুভ আচার শেষ হওয়ার পর রানী কীর্তিদা ছলছল চোখে ঋষি গর্গের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। মায়ের মন তো কোন ভয় বা খুত সইতে পারে না। রানী আকুল হয়ে বললেন হে গুরুদেব আপনি তো সর্বজ্ঞ আমায় কৃপা করে বলুন আমার এই ফুটফুটে রাধার
00:58:56
গায়ের আলো তো কোটি সূর্যের চেয়েও সুন্দর তার রূপ তো চোখ জুড়িয়ে দেয় কিন্তু সে কেন তার চোখ দুটি খুলছে না সে কেন নিজের মুখখানা আমাদের দিকে তুলে তাকাচ্ছে না তবে কি আমার রাধা এই সুজলা সুফলা ব্রজভূমিকে দেখতে পাবে না সে কি দৃষ্টিহীন রানী কীর্তিদার করুণ বার্তা শুনে গোরাজ বৃষভানুর চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ল। প্রাসাদে উপস্থিত সমস্ত গোপ গোপীদের কোল জুড়ে যে আনন্দের জোয়ার উঠেছিল তা যেন এক [মিউজিক] নিমেশে নীরবতায় ডুবে গেল। সবাই সুখে থেকেও গভীর বিষাদে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। ঋষিগর্গ শান্ত মুখে শিশুর রাধার দিকে আবার
00:59:42
তাকালেন। তিনি মুচকি হেসে রাজাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, হে মহারাজ অধৈর্য হবেন না। ব্যাকুল হওয়ার কোন কারণ নেই। এই শিশু অন্ধ [মিউজিক] নয় কিংবা তার চোখে কোন ত্রুটিও নেই। তিনি হলেন পরম প্রতিব্রতা ও পূর্ণ শক্তির প্রতীক। যিনি জগতের আদি আলো। যিনি পরমেশ্বরের হৃদয়বাসিনী তিনি স্বয়ং স্থির করেছেন যে এই [মিউজিক] মর্তলোকের কোন সাধারণ রূপ বা সাধারণ মানুষকে তিনি তার জীবনের প্রথম আলো হিসেবে দেখবেন না। তিনি অপেক্ষা করছেন এক নির্দিষ্ট পরম স্পর্শের জন্য। ঋষি গর্গের এই রহস্যময় কথা শুনে রাজা ও রানী কিছুটা সান্ত্বনা পেলেও তাদের মনের
01:00:29
গভীর ব্যাকুলতা কমলো না। বর্ষানার রাজপ্রাসাদে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে রয়েছে। একপাশে যেমন ঘরে পরম ঐশ্বর্যময়ী কন্যা আসার আনন্দ তেমনি ফুটফুটে শিশুকন্যার রাধার চোখ না মেলার গভীর উদ্বেগ। রাজা বৃষভানু ও রানী কীর্তিদা কন্যে কোলে নিয়ে ব্যাকুল মনে কেবল ঈশ্বরের কৃপা প্রার্থনা করছিলেন। প্রাসাদে উপস্থিত সবাই ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছিলেন কখন কাটবে এই বিষাদের ছায়া? কবে ফুটবে শিশুকন্যার নয়নে আলোর অমীয় ধারা। ঠিক সেই মুহূর্তে রাজপ্রাসাদের প্রধান ত্বরণে শোনা গেল আনন্দরল। স্বয়ং গোকুলপতি নন্দ মহারাজ এবং মাতায যশোদা তাদের ছোট্ট
01:01:18
গোপালকে সঙ্গে নিয়ে বৃষভানুর রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হলেন। প্রিয় বন্ধুর ঘরে কন্যাপুত্রীর আগমন ঘটেছে শুনে নন্দ মহারাজ আর স্থির থাকতে পারেননি। আনন্দ সংবাদ শোনা মাত্রই ছুটে এসেছেন বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানাতে। রাজা বৃষভানু এগিয়ে গিয়ে নন্দ মহারাজকে পরম শ্রদ্ধায় কোলাকুলি করলেন। রানী কীর্তিদা দৌড়ে এসে মাতা যশোদাকে [মিউজিক] জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু শোখ আর উদ্বেগে ভরা রানী কীর্তিদার চোখ দুটো জলে ছলছল করছিল। মাতা যশোদা পরম মমতায় বোনকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। সেই সময় মাতা যশোদার কোল থেকে নেমে পুচকে বালকৃষ্ণ ধীরে
01:02:01
ধীরে হামাগড়ি দিয়ে হেঁটে যেতে লাগলেন সোজা সেই সুবর্ণ দোলনার দিকে যেখানে পরম শান্ত হয়েছিল ছোট্ট রাধা। কারো নজর ছিল না সেই ছোট্ট গোপালের দিকে। কৃষ্ণ যেন এক গোপন আকর্ষণে টানে টানে এগিয়ে চললেন তার পরম প্রিয়ার কাছে। দোলনার কাছে পৌঁছে [মিউজিক] কৃষ্ণ তার দুটি হাত বাড়িয়ে দিলেন। পরম চপলতায় এক লাফে দোলনার কানায় হাত রেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং অতি স্নেহ ও মমতায় নিজের ছোট্ট দুটি কোমল হাত চেপে ধরলেন শিশুকন্যা রাধার মুখে ও নয়নে। আর ঠিক তখনই ঘটে গেল সেই পরম অলৌকিক মহাজাগতিক ঘটনা। বালকৃষ্ণের শ্রী অঙ্গের
01:02:47
পরম পবিত্র স্পর্শ পাওয়া মাত্রই শিশুকন্যা রাধার পুরো শরীরে যেন এক [মিউজিক] অপূর্ব আনন্দের রোমাঞ্চ খেলে গেল। সুবর্ণ পদ্বের মত দুটি বন্ধ নয়ন পাপড়ির মত ধীরে ধীরে খুলে গেল। স্বর্গের দেবতারা শূন্যে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে দেখলেন যে আঁখি যুগল এ যাবৎ সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের কোন রূপ দেখতে সম্মত হয়নি সেই পরম প্রতিব্রতা আদ্যশক্তি দেবী রাধিকা মর্তলোকে চোখ খুলেই প্রথম দর্শন করলেন তার প্রাণের ঠাকুর পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে রাধার পদ্ম্বপলাশ আঁখিতে ফুটে উঠলো অচেনা এক স্বর্গীয় দুতি কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে শিশুকন্যা রাধা এক অপ পূর্ব মুচকি হাসি
01:03:32
হাসলো। কৃষ্ণ তার পানে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। দুই অলৌকিক শক্তির সেই রূপ দেখে মনে হলো যেন বহুকাল পর দুই অখন্ড প্রেমধারা এসে এক বিন্দুতে মিলিত হলো। হঠাৎ শিশুদের এই হাসির শব্দ শুনে রানী কীর্তিদা ও মাতা যশোদা চমকে উঠে দোলনার দিকে তাকালেন। রানী কীর্তিদা চোখের জল মুছে যা দেখলেন তা বিশ্বাস করতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগলো। তিনি দেখলেন তার অন্ধ মনে হওয়া কন্যাপুত্রী আজ পূর্ণ নয়ন মেলে পরম আনন্দে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে হাসছে। রাধার সেই ডাগর ডাগোর কালো চোখের দুতিতে যেন পুরো ঘর আলোয় আলোকময় হয়ে উঠেছে।
01:04:17
আমার রাধা চোখ মেলেছে আমার রাধা দেখতে পাচ্ছে। আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন রানী কীর্তিদা। পুরো রাজপ্রাসাদ মুহূর্তে আবার মেতে উঠলো এক অভূতপূর্ব আনন্দের বন্যায়। রাজা বৃষভানু ও নন্দ মহারাজ আনন্দে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন। মাতা যশোদা কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিয়ে রাধার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম আশিষ দান করলেন। গোপ গোপীরা আনন্দে নাচতে শুরু করলেন। শাখ অঘন্টার ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরীত হয়ে উঠল। ঋষি গর্গের সেই ভবিষ্যৎবাণী আজ হুবহু মিলে গেল। রাধা সত্যি তার পরম স্পন্দনের জন্যেই এতদিন অপেক্ষা করেছিলেন। কৃষ্ণকে প্রথম দর্শন না করে তিনি এ জগতের আর কিছুই দেখতে
01:05:03
চাননি। বর্ষানার রাজপ্রাসাদে রাধার নয়ন উন্মিলনের সেই পরম অলৌকিক ঘটনার পর দেখতে দেখতে কেটে যেতে লাগলো সময়। ব্রজভূমির বুক জুড়ে তখন এক পরম সুখ আর শান্তির হাওয়া। রাওয়াল ও বর্ষানার প্রতি ঘরে ঘরে যেন এক আনন্দের আলো জ্বলে উঠলো। দিন কেটে মাস আসে আর তার সাথে সাথে দুটি শিশুও ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। গোকুলে নন্দদুলাল শ্রীকৃষ্ণ আর বর্ষায় গোরাজ বৃষভানুর প্রাণের দুলালী দেবী রাধা। রাধা ও কৃষ্ণের শৈশব কেবল সাধারণ কোন শিশুদের বেড়ে ওঠা ছিল না। তা ছিল এক পরম পবিত্র খেলা। রাধা যখন ছোট ছোট পায়ে বর্ষানার উঠানে হাঁটতে
01:05:48
শিখলেন তার নুপুরের মিষ্টি রুনু ঝুনু শব্দে যেন সমস্ত পরিবেশ শান্ত হয়ে যেত। অন্যদিকে বৃন্দাবন আর গোকুলের মেঠো পথে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুর ভেসে আসতো। অদ্ভুত বিষয় হলো রাধা ও কৃষ্ণের এই শৈশবের বন্ধন দিন দিন এক গভীর টানে পরিণত হতে লাগল। রাধা ও কৃষ্ণ যখনই একে অপরের সামনে আসতেন তখন মনে হতো যেন দুটি ভিন্ন দেহ নয় বরং একটি মাত্র প্রাণ দুটি রূপে খেলা করছে। কৃষ্ণ যখন যমুনার তীরে গোপালদের সাথে খেলা করতেন তখন বর্ষানায় বসে রাধার মন আনন্দে ভরে উঠতো। আবার রাধা যখন কুসুম কাননে সখীদের সাথে ফুল তুলতেন তখন বৃন্দাবনে
01:06:34
শ্রীকৃষ্ণের মুখে এক অপূর্ব হাসির ধুতি ফুটে উঠতো। একদিন মহর্ষি গর্গ আবার বৃষভানুর প্রাসাদে উপস্থিত হলেন। গোপরাজ বৃষভানু পরম শ্রদ্ধায় ঋষির চরণে প্রণাম জানিয়ে বললেন, হে মহামতী গুরুদেব, আমার রাধা আর ওই গোকুলের ওই কৃষ্ণ দুজনের মধ্যে এমন এক অলৌকিক টান দেখি যা আমি সাধারণ বুদ্ধিতে বুঝে উঠতে পারি না। এরা যেন একে অপরের ছায়া। শাস্ত্র মতে এই পরম সম্পর্কের রহস্যটা আসলে কি? কৃপা করে আমাকে বুঝিয়ে বলুন। ঋষিগর্গ পরম শান্ত মুখে স্মিত হেসে বললেন হে মহারাজ বৃষভানু এই রহস্য অতি গভীর ও গুড়। তুমি যাকে তোমার কন্যা মনে করছো আর নন্দ মহারাজ যাকে
01:07:24
নিজের পুত্র মনে করছেন তারা কেবল কোন মর্তের রক্তমাংসের সাধারণ শিশু নন। শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর। পরম পুরুষ আর দেবী রাধা হলেন তারই নিজস্ব আল্লাদিনী শক্তি। একটি মুদ্রা যেমন দুটি পিঠ ছাড়া অসম্পূর্ণ দুধ আর তার শুভ্রতা যেমন আলাদা করা যায় না, ঠিক তেমনি শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রী রাধা এক ও অভিন্ন। ঋষিগর্গ মহারাজ বৃষভানুকে আরো সহজ করে বুঝিয়ে বললেন, যেমন আগুনের সাথে তার উত্তাপ জড়িয়ে থাকে। উত্তাপ ছাড়া আগুনের কোন অস্তিত্ব থাকে না। ঠিক তেমনি রাধা ছাড়া কৃষ্ণের কোন পূর্ণতা নেই। কৃষ্ণ
01:08:10
হলেন সর্বশক্তিমান। আর রাধা হলেন সেই শক্তির পরম উৎস। কৃষ্ণ যখন জগতে আনন্দ ছড়িয়ে দেন তখন সেই আনন্দের মূল রস যোগান দেবী রাধা। তাই তাদের এই বাল্যলীলা কোন সাধারণ মোহ বা সম্পর্ক নয়। এটি হলো আত্মার সাথে পরমাত্মার পরম মিলন। গর্গমুনির এই গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা শুনে মহারাজ বৃষভানুর মন পরম শান্তিতে ভরে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন তার ঘরে যে কন্যা আবির্ভূত হয়েছেন তিনি কেবল পরম পিতার ভালোবাসার পাত্রী নন বরং সমগ্র জগতের আদ্যশক্তি। ধীরে ধীরে রাধা ও কৃষ্ণ ব্রজভূমির বুকে পরম ভক্তি ও প্রেমের এক নতুন রূপ প্রকাশ করতে লাগলেন। গোপ গোপীরা যখনই কোন বিপদে
01:09:02
[মিউজিক] পড়তেন কিংবা ব্রজধামে দানবদের উপদ্রব হতো কৃষ্ণের কৃপার পাশাপাশি দেবী রাধার পূণ্যময় অস্তিত্বই যেন পুরো ব্রজভূমিকে [মিউজিক] এক অদৃশ্য রক্ষা কবচ দিয়ে ঘিরে রাখতো। ব্রজবাসীরা অনুভব করতে লাগলেন রাধা নাম জপ না করলে কৃষ্ণ কৃপা মেলে না। আর কৃষ্ণকে না ভোজলে রাধার পরম ভক্তি পাওয়া যায় না। কিন্তু মর্তের এই রূপময় শৈশব লীলার মাঝে কিভাবে এই পরম ব্রতের মহিমা মানুষের সামনে প্রকাশিত হলো। কিভাবে মহর্ষি ব্যাসদেব এই পরম শুভ রাধা অষ্টমী ব্রতের কথা জগৎকে [মিউজিক] জানিয়েছিলেন যা পালন করলে মানুষের সমস্ত পাপ দূর হয়। এবার তা আমরা ধীরে ধীরে
01:09:47
জানবো। মর্তলোকের ব্রজধামে যখন শ্রী রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত শৈশব লীলা আনন্দে ভেসে যাচ্ছিল ঠিক তখন ব্রহ্মান্ডের অন্য প্রান্তে পরম পবিত্র বদরিক আশ্রমে এক অন্য অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছিল। হিমালয়ের শান্ত নিভৃত আশ্রমে বসে ধ্যানমগ্ন ছিলেন বেদবিভাগকারী পরম ঋষি ব্যাসদেব। তার চারপাশে তখন এক অলৌকিক শান্ত পরিবেশ। এমন সময় হাতে বিনা নিয়ে কন্ঠে হরি গুণগান গাইতে গাইতে সেখানে উপস্থিত হলেন দেবর্ষী নারদ। দেবর্ষী নারদ ব্যাসদেবের চরণে প্রণাম জানিয়ে কৃতাঞ্জলি পুটে দাঁড়িয়ে বললেন হে মহর্ষি ব্যাসদেব আপনি বেদকে চার
01:10:37
ভাগে বিভক্ত করেছেন। পরম পুণ্যময় মহাভারত রচনা করেছেন। বহু পুরাণ রচনা করে মানবজাতির উদ্ধারের পথ দেখিয়েছেন। তবুও আপনার মন কেন এমন ভারাক্রান্ত মনে হচ্ছে? মর্তলোকের সাধারণ মানুষ তো পাপ ও দুঃখের সাগরে ডুবে রয়েছে। কলিযুগের মানুষের আয়ু কম, তেজ কম আর ধৈর্য অতি সামান্য। এমন কোন পরম সহজ ও পবিত্র পথের [মিউজিক] কথা কি শাস্ত্রে নেই? যা পালন করলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই পরমেশ্বরের পরম ভক্তি ও মুক্তি লাভ করতে পারে। দেবর্শী নারদের এই ব্যাকুল প্রশ্ন শুনে মহর্ষি ব্যাসদেব নয়ন মেললেন। তার মুখে ফুটে উঠলো এক পরম প্রশান্তির
01:11:25
হাসি। ব্যাসদেব [মিউজিক] বললেন, হে দেবর্ষী, তুমি অতি উত্তম ও কল্যাণকর প্রশ্ন করেছ। মানবজাতির উদ্ধারের জন্য যে পরম গুহ ও পবিত্র ব্রতের কথা পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে বর্ণিত হয়েছে আজ আমি তোমাকে সেই মহাব্রতের কথাই শোনাবো। এটি হল শ্রী রাধা অষ্টমী ব্রত। ব্যাসদেব বলতে শুরু করলেন, ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথি হল স্বয়ং জগৎজননী দেবী রাধার প্রাকট্য দিবস। যেদিন অনুরাধা নক্ষত্রের শুভ যোগে স্বয়ং আহলাদিনী শক্তি মর্তের বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই দিনটি হল সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রতের দিন। এই ব্রত কেবল সাধারণ কোন আচার অনুষ্ঠান নয় এটি হল
01:12:15
কৃষ্ণ ভক্তির পরম চাবিকাঠি। নারদ পরম বিশ্বয় ও কৌতুহলে জিজ্ঞাসা করলেন, হে গুরুদেব, এই ব্রতের সূচনা কিভাবে হলো এবং কেন এই ব্রতকে বৈষ্ণব ও স্মার্থ শাস্ত্রে এত বড় স্থান দেওয়া হয়েছে? ব্যাসদেব তখন দেবর্শী নারদকে অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে বললেন, হে নারদ, শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম পুরুষ আর দেবী রাধা হলেন তারই আদ্যশক্তি। শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম আনন্দ। আর সেই আনন্দকে আস্বাদন করানোর মূল রস হলেন রাধা। জগতের রাধা নাম ব্যতিরেখে কৃষ্ণ কৃপা লাভ করা অসম্ভব। যে ব্যক্তি ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে পরম নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে
01:13:05
শ্রী রাধার আবির্ভাব তিথি পালন করে সে 1000 একাদশী ব্রত পালনের সমতুল্য পূণ্য লাভ করে। ব্যাসদেব [মিউজিক] আরো বললেন, এই ব্রতের প্রাকট্য মাহাত্ব অতি অলৌকিক। পুরান মতে যে ভক্ত ভাদ্র মাসের এই অষ্টমীতে নিরামেষ আহার করে উপবাস থেকে মধ্যান্যকালে শ্রী রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের যুগল মূর্তির পূজার্চনা করে। তার জন্ম জন্মান্তরের পাপ ও দারিদ্র্য এক নিমেশে [মিউজিক] ধুয়ে মুছে ছাই হয়ে যায়। গৃহে কখনো অন্য ও সুখ শান্তির অভাব হয় না। এমনকি পরম অন্তিমকালে সে পরমধামে শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দ লাভ করে। দেবর্শী নারদ ব্যাসদেবের মুখে এই পরম ব্রত মাহাত্ব
01:13:52
[মিউজিক] শুনে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি হাত জোড় করে বললেন, হে মহর্ষি, এই ব্রতের প্রাকট্য কাহিনী ও শাস্ত্রীয় সত্য মানবজাতির জন্য এক পরম আশীর্বাদ স্বরূপ। কিন্তু শাস্ত্রের বিভিন্ন পুরাণে দেবী রাধার প্রাকট্য নিয়ে কি কোন ভিন্ন রূপের বর্ণনাও রয়েছে? ভক্তরা কিভাবে সেই শাস্ত্রীয় সত্যকে উপলব্ধি করবে? মহর্ষি ব্যাসদেব তখন রহস্যময় হেসে বললেন, হে দেবর্শী, বিভিন্ন পুরাণে পরম শক্তির এই প্রাকট্যকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। পদ্মপুরাণ, গর্গ সংহিতা এবং ব্রহ্ম [মিউজিক] বৈবর্ত পুরাণে কিভাবে এই পরম আদ্যশক্তির লৌকিক
01:14:37
লীলা বর্ণিত হয়েছে তা তোমাকে বিস্তারিত বলছি। শোনো দেবর্শী নারদ নম্রকন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন হে পরমপূজ্য গুরুদেব শ্রী রাধার প্রাকট্য ও স্বরূপ নিয়ে বিভিন্ন পুরাণে যে সুন্দর বর্ণনা রয়েছে তা কৃপা করে আমাকে বিশদভাবে বুঝিয়ে বলুন ভক্তেরা কিভাবে ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ ও পদ্মপুরাণের এই পরম সত্যকে উপলব্ধি করবে মহর্ষি ব্যাসদেব স্মিত হেসে বলতে শুরু করলেন হে দেবর্ষী শ্রী রাধা হলেন পরমেশ্বরের আলহাদিনী শক্তি। তিনি এক হলেও বিভিন্ন শাস্ত্রে ঋষিগণ তার প্রাকট্যকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শন করেছেন। তবে মনে রাখবে এই দুই বর্ণনা আপাদৃষ্টিতে
01:15:24
আলাদা মনে হলেও তাদের মূল সুর কিন্তু এক ও অভিন্ন। ব্যাসদেব প্রথম বর্ণনা শুরু করলেন পদ্মপুরাণ ও গর্গ সংহিতার আলয়। তিনি বললেন পদ্মপুরাণ ও গর্গ সংহিতায় দেবী রাধার অজনীজা প্রাকট্যকে প্রধান স্থান দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে দেবী রাধা কোন সাধারণ মানুষের মত মাতৃগর্ভে নয় বরং সরাসরি পরমেশ্বরের নির্দেশে ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাজা বৃষভানু যখন যমুনার পবিত্র জলে স্নান ও তপস্যা করছিলেন তখন তিনি সুবর্ণ পদ্বের ওপর সেই পরম জ্যোতির্ময়ী শিশুকন্যাকে লাভ করেন। এখানে রাধাকে একদম নিষ্কলঙ্ক, অজনীজা ও পরম আদ্যশক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর সেই
01:16:11
শিশুকন্যা কৃষ্ণস্পর্শ লাভ না করা পর্যন্ত নিজের নয়ন উন্মিলন করেননি। ভক্তি সাধনায় এই বর্ণনাটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ও হৃদয়গ্রাহী। এরপর মহর্ষি ব্যাসদেব ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণের অন্য এক পরম রহস্যময় ব্যাখ্যার কথা বললেন। তিনি নারদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে নারদ এবার ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণের শ্রীকৃষ্ণ জন্মখন্ডের গুড় তত্ত্ব শোনো। ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে গোলোকে সেই প্রারম্ভিক অভিশাপীলাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গোলকে শ্রীধমের সাপের কারণে দেবী রাধাকে মর্তে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। কিন্তু পরম শক্তি তো কখনো সাধারণ দুঃখ কষ্টের অধীন হতে পারেন না। তাই
01:16:57
ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে ছায়া রাধা বা মায়া তত্ত্বের বর্ণনা পাওয়া যায়। ব্যাসদেব আরো স্পষ্ট করে বললেন, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ অনুসারে দেবী রাধার মূল অপ্রাকৃত রূপটি সদা সর্বদা পরম পবিত্র ও স্পর্শাতীত। মর্তলোগে যখন দেবী কীর্তিদা গর্ভবতী বলে মনে হয়েছিলেন তা আসলে ছিল কেবল পবনদেবের এক লীলা। বায়ুর সাহায্যে দেবী কীর্তিদার উদরে এক মায়া বা ছায়া স্থাপন করা হয়েছিল। ঠিক উপযুক্ত সময়ে অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে সেই বায়ুই বাইরে নির্গত হয় এবং তারই মাঝে দেবীর অজনীজা রূপটি মর্তের সামনে প্রকটিত হয়। অর্থাৎ মর্তের কোন পঙ্কিলতা
01:17:42
বা সাধারণ জন্মবিধান দেবী রাধাকে স্পর্শ করতে পারেনি। মহর্ষি ব্যাসদেবের মুখে এই পরম তত্ত্ব শুনে দেবর্শী নারদের হৃদয়ের সমস্ত সংশয় দূর হয়ে গেল। নারদ হাত জোড় করে বললেন, অপূর্ব হে মহর্ষি আপনার মুখে এই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা শুনে আমার মন আনন্দে ভরে গেল। তার মানে পুরাণভেদে কাহিনীর উপস্থাপনা সামান্য ভিন্ন হলেও আসল সত্যটি হলো দেবী রাধা হলেন স্বয়ং পরমেশ্বরের নিত্যশক্তি। যিনি কেবল ভক্তদের কৃপা করার জন্যই এই মর্তধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ব্যাসদেব সম্মতি জানিয়ে বললেন, একেবারে সত্যক কথা দেবর্ষী। পদ্মপুরাণ আমাদের শেখায় রাধার পরম পবিত্র
01:18:26
প্রাকট্যের ভক্তিভাব। আর ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ আমাদের দেখায় তার অচিন্ত শক্তি ও মায়াতীত রূপ। যে ভক্ত এই দুই পুরাণের মূল ভাবকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে সে সহজেই বুঝে নেয় যে রাধা ও কৃষ্ণের মিলন কোন লৌকিক ঘটনা নয়। এটি হলো পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার পরম মিলন। বদরিক আশ্রমে ব্যাসদেবের পরম জ্ঞানগর্ভ বাণী শুনে দেবর্শী নারদের মন এক অপূর্ব আনন্দে ভরে উঠেছিল। পুরণের গভীর তত্ত্ব শোনার পর দেবর্শী নারদের মনে আবার এক নতুন আকুলতা জেগে উঠল। >> [মিউজিক] >> তিনি পরম বিনয়ে মহর্ষি ব্যাসদেবকে প্রণাম জানিয়ে বললেন, হে গুরুদেব, আপনার মুখে
01:19:09
পুরান কথা শুনে আমার অন্তরাত্মা জুড়িয়ে গেল। কিন্তু সাধারণ ভক্তের মনে একটি সহজ প্রশ্ন বারবার জাগে। আমরা তো পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করি। তবে কৃষ্ণের কৃপা পেতে হলে কেন দেবী রাধার নাম আগে জপ করতে হয়? ভক্তি সাধনায় এই রাধা নামের আসল জোরটা কোথায়? দেবর্শী নারদের এই ব্যাকুল প্রশ্ন শুনে মহর্ষি ব্যাসদেব এক গভীর ও পরম স্নেহময় হাসি হাসলেন। তিনি বললেন, হে দেবর্শী, তুমি অতি সুন্দর এক মার্গীয় সত্যের কথা তুলেছো। বৈষ্ণব ভাবধারায় [মিউজিক] ও সকল শাস্ত্রে একটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ হলেন করুণার সাগর। আর সেই সাগরে [মিউজিক]
01:19:51
পৌঁছানোর একমাত্র সহজ সেতু হলেন দেবী রাধা। কৃষ্ণ হলেন করুণাময়। কিন্তু রাধিকা হলেন স্বয়ং কৃপাময়ী। ব্যাসদেব গল্পছলে নারদকে আরো সহজ করে বুঝিয়ে বলতে শুরু করলেন, মনে করো পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন এক সুবিশাল রাজপ্রাসাদের অধিপতি। সেই প্রাসাদের দ্বার সবসময় বন্ধ থাকে সাধারণ পাপী তাপী মানুষের জন্য। কারণ মানুষের অপরাধ ও পাপের বোঝা অনেক বেশি। [মিউজিক] কিন্তু দেবী রাধা হলেন সেই পরম পিতার ঘরের স্নেহময়ী মাতা। একজন সন্তান শত অপরাধ করলেও মা যেমন তাকে দূরে ঠেলে দিতে পারেন না পরমেশ্বরী রাধারানীও তেমনি কোন ভক্তের
01:20:32
সামান্য ভক্তি দেখলে আর স্থির থাকতে পারেন না তিনি নিজে কৃষ্ণের কাছে গিয়ে সেই ভক্তের জন্য সুপারিশ করেন ব্যাসদেব বলতে লাগলেন শাস্ত্র মতে কেউ যখন কেবল কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে ডাকে তখন পরমেশ্বর পরম গম্ভীর হয়ে তার ন্যায়বিচারের তুলাদন্ড নিয়ে বসে থাকেন। তিনি দেখেন সেই ভক্তের কতটা পুণ্য আছে কতটা যোগ্যতা আছে। কিন্তু কেউ যখন আকুল হয়ে রাধা রাধা বলে ডেকে ওঠে তখন কৃষ্ণের সেই গাম্ভীর্য এক নেমে সে গোলে জল হয়ে যায়। কারণ রাধা নাম হলো কৃষ্ণের সবচেয়ে প্রিয় সুর। রাধা নামের সুবাস কানে পৌঁছানো মাত্রই কৃষ্ণ আর ভক্তের
01:21:11
পাপপুণ্যের হিসেব দেখতে বসেন না। তিনি ছুটে আসেন সেই ভক্তের কাছে। মহর্ষি ব্যাসদেব আরো একটি পরম সুন্দর দৃষ্টান্ত দিলেন। তিনি বললেন, হে নারদ রাধা শব্দটিকে যদি একটু উল্টে দেওয়া হয় তবে তা হয় ধারা। অর্থাৎ যে পরম প্রেম ধারা অনবরত পরমেশ্বরের চরণের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে তাই হলো রাধা। আর রাধারানী যখন প্রসন্ন হন তখন সেই প্রেমের ধারা সোজা ভক্তের হৃদয়ে এসে পড়ে। তাই বলা হয় রাধা ছাড়া কৃষ্ণ ভক্তি অসম্পূর্ণ অসার ও কাঁচা। রাধা নাম হলো এমন এক অমূল্য চাবিকাঠি যা দিয়ে পরমেশ্বরের কৃপার দরজা নিমেশে খুলে যায়। দেবর্শী
01:21:53
নারদ তন্ময় হয়ে ব্যাসদেবের প্রতিটি কথা শুনছিলেন। ব্যাসদেব বলতে লাগলেন, ব্রজধামের দিকে তাকালেই তুমি দেখতে পাবে সেখানকার মাটির অণুতে, পরমাণুতে তরুলতায়, যমুনার জলে কেবল রাধা নাম মুখরীত হচ্ছে। ব্রজের গোপ গোপীরা বা সাধারণ ভক্তেরা যখন একে অপরের সাথে দেখা করেন তারা জয় শ্রী রাধে বলেই কুশল বিনিময় করেন। কারণ তারা জানেন রাধা নাম জপ করলে কৃষ্ণ কৃপা পেতে আর কোন আলাদা সাধনা করতে হয় না। রাধা প্রসন্ন হলে কৃষ্ণ স্বয়ং সেই ভক্তের কাছে এসে ধরা দেন। ব্যাসদেবের এই পরম ভক্তিময় কথা শুনে দেবর্শী নারদের চোখে জলের ধারা
01:22:32
নেমে এল। তিনি বুঝতে পারলেন রাধা অষ্টমী ব্রত কেবল একটি তিথি পালন নয়। এটি হলো কৃষ্ণের পরম ক্রিয়ার চরণে আত্মনিবেদনের এক মহা সুযোগ। মহর্ষি ব্যাসদেবের মুখে শ্রী রাধা নামের এই পরম অপার্থিব মাহাত্ব শুনে দেবর্শী নারদের হৃদয় এক গভীর ভক্তিতে ভরে উঠলো। তিনি করজোড়ে প্রণতি জানিয়ে পরম বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা [মিউজিক] করলেন, হে সর্বজ্ঞ গুরুদেব, শ্রী রাধার চরণে আত্মনিবেদনের এই পরম পথটি তো অতি সুন্দর। কিন্তু মর্তের সাধারণ মানুষ যারা সংসারে নানা কাজের মাঝে দিন কাটায় তারা কিভাবে এই ভাদ্র মাসের বিশেষ পূর্ণতিথিতে রাধা অষ্টমী ব্রত পালন করবে। এই ব্রতের
01:23:13
সঠিক নিয়ম সকালের সংকল্প থেকে শুরু করে দুপুরের বিশেষ পূজার বিধিগুলো কৃপা করে আমাকে বিস্তারিত বলুন যাতে জগৎবাসী এই ব্রত পালন করে পরম কল্যাণ লাভ করতে পারে। মহর্ষি ব্যাসদেব পরম করুণা ভরে স্মিত হেসে বলতে শুরু করলেন হে দেবর্ষী শোনো রাধা অষ্টমী ব্রতের নিয়ম অতি পবিত্র অথচ শ্রদ্ধাবান ভক্তের জন্য পরম আনন্দময় এই ব্রতের প্রস্তুতি কিন্তু অষ্টমীর দিন সকাল থেকে নয় বরং আগের দিন অর্থাৎ সপ্তমীর দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ব্যাসদেব প্রথাগত ব্রতবিধির প্রথম ধাব ব্যাখ্যা করে বললেন সপ্তমীর দিন ব্রতিকে কে সম্পূর্ণ সাত্তবিক
01:23:57
ও নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হয়। নিজের মন ও শরীরকে সংযত রেখে সমস্ত কলুষতা থেকে দূরে থাকতে হয়। আর পরদিন অর্থাৎ ভাদ্র মাসের সেই শুভ শুক্লা অষ্টমীর ব্রাহ্ম মুহূর্তে সূর্যোদয়ের ঠিক আগে ঘুম থেকে উঠতে হয়। সকালে সজ্যা ত্যাগ করেই প্রথম কাজ হলো মনে মনে পরমেশ্বরী দেবী রাধা ও পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম স্মরণ করা। এরপর ব্যাসদেব সংকল্প ও প্রাতকৃত্বের কথা বললেন। ব্রতিকে প্রাতকৃত্ব শেষ করে তিল, আমলকী বা সুগন্ধি দ্রব্য মিশ্রিত পবিত্র জলে স্নান করতে হয়। স্নানের সময় মনে ভাবনা রাখতে হয় যেন গঙ্গা, যমুনা ও
01:24:39
সরস্বতীর মত পরম পবিত্র নদীদের জল অঙ্গস্পর্শ করছে। স্নান শেষ করে পরিষ্কার সুচিনাল শুভ্র বা পীত বস্ত্র পরিধান করতে হয়। এরপর পূজাস্থলে বসে পূর্ব বা উত্তর দিকে মুখ করে ডান হাতে জল, কুষ ও তাম্রপাত্র নিয়ে পরম নিষ্ঠার সাথে ব্রতের সংকল্প করতে হয়। হে পরমেশ্বরী শ্রী রাধে হে কৃষ্ণপ্রিয়া আজ আমি তোমার শুভ প্রাকট্য তিথিতে পূর্ণ নিষ্ঠা ও ভক্তি ভরে এই ব্রত পালনের সংকল্প করছি। আমার পূজা গ্রহণ করে আমাকে কৃষ্ণ ভক্তি প্রদান করো। ব্যাসদেব পূজার বিশেষ সময়ের দিকে নির্দেশ করে বললেন, হে নারদ, এই ব্রতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল পূজার সময়।
01:25:26
যেহেতু দেবী রাধিকা মধ্যান্য কালে অর্থাৎ দুপুরবেলা মর্তের বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাই রাধা অষ্টমীর মূল পূজাটি মধ্যান্য কালেই সম্পন্ন করা পরম নিয়ম। দুপুরবেলা পূজাবেদী সুন্দর করে ফুল, পাতা ও আলোপনা দিয়ে সাজাতে হয়। সেখানে একটি পরিষ্কার আসনে রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ বা সুন্দর ছবি স্থাপন করতে হয়। পূজা পদ্ধতির বিবরণ দিয়ে মহর্ষি ব্যাসদেব আরো বললেন, প্রথমে তাম্র বা পিতলের পাত্রে রাধাকৃষ্ণের শ্রী বিগ্রহকে পঞ্চামৃত অর্থাৎ দুধ, দধি, ঘিত, মধু ও শর্করা দিয়ে পরম অনুরাগে অভিষেক করাতে হয়। অভিষেকের পর বিগ্রহকে পরিষ্কার জলে স্নান করিয়ে
01:26:11
নতুন নববস্ত্র ও নানা অলংকারে সাজিয়ে তোলা হয়। এরপর চন্দন, সুগন্ধি আতর, লাল ও হলুদ পুষ্প বিশেষ করে পদ্ব ও বেলপাতা দেবীর চরণে নিবেদন করতে হয়। ব্যাসদেব নিবেদনের সূক্ষ নিয়মটি বুঝিয়ে বললেন। দেবী রাধার পূজায় সুগন্ধি, ধূপ, প্রদীপ ও নৈবেদ্য সাজিয়ে দিতে হয়। নৈবেদ্য হিসেবে নানা রকম ঋতুফল, পঞ্চমেওয়া, ক্ষীর, মাখন মিশ্রী এবং রমারি মিষ্টান্য নিবেদন করা হয়। তবে এখানে একটি পরম গোপন নিয়ম মনে রাখতে হয়। শ্রীকৃষ্ণের চরণে যেমন তুলসীপত্র অর্পণ করা অনস্বীকার্য, দেবী রাধার চরণে কিন্তু সরাসরি তুলসী না দিয়ে কৃষ্ণের চরণে অর্পিত তুলসীপত্র বা কৃষ্ণের
01:26:56
প্রসাদী তুলসী দেবীর কৃত্য অর্থে নিবেদন করা সবচেয়ে ভালো। এরপর প্রদীপ দিয়ে রাধা মাধবের আরতি করতে হয় এবং ব্রতকথা পাঠ বা শ্রবণ করতে হয়। মহর্ষি ব্যাসদেবের মুখে অষ্টমীর দিনের পূজা ও আরাধনার কথা শুনে দেবর্শী নারদ পরম তৃপ্তি লাভ করলেন। কিন্তু ব্রতের পূর্ণতা তো কেবল পূজাতেই শেষ হয় না। যে কোন ব্রতের আসল সাফল্য লুকিয়ে থাকে তার সঠিক উদযাপন ও পারণের মধ্যে। দেবর্শী নারদ হাত জোড় করে বিনম্র কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন হে গুরুদেব অষ্টমীর দিন নিষ্ঠাভরে পূজা ও উপবাস পালনের পর ব্রতি কিভাবে তার এই পূর্ণব্রত উদযাপন করবে নবমী তিথিতে ব্রত সমাপ্তি বা পারণের
01:27:39
সঠিক শাস্ত্রীয় নিয়ম কি কোন ভুল করলে ব্রতের ফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে তা কৃপা করে আমাকে বলুন মহর্ষি ব্যাসদেব দেবর্শী নারদের আকুলতা দেখে স্মিত মুখে বলতে শুরু করলেন হে দেবর্শী শোন রাধা অষ্টমী ব্রতের পারণ হলো ব্রতানুষ্ঠানের পরম অন্তিম ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অষ্টমীর সারাদিন উপবাস ও পূজার পর নবমী তিথিতে সঠিক নিয়মে পারণ না করলে ব্রত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ব্যাসদেব পারণের প্রথম কাজের কথা বললেন। পরদিন অর্থাৎ নবমী তিথিতে প্রাতককালে সূর্যোদয়ের আগেই সজ্যা ত্যাগ করতে হয়। সকালে স্নান ও নিত্যক্রিয়া শেষ করে ভক্তকে পুনরায় পূজাস্থলে গিয়ে বুনিয়াদী
01:28:22
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সারতে হয়। এরপর শ্রী রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভক্তিভরে প্রণাম জানিয়ে ধূপ, দীপ ও সুগন্ধি পুষ্প দিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রাত পূজা সম্পন্ন করতে হয়। মনে রাখতে হবে অষ্টমীর দিন যেমন আনন্দে মন ভরা ছিল নবমীর সকালেও ঠিক তেমনিই পবিত্র ভাব বজায় রাখা প্রয়োজন। ব্যাসদেব এরপর অন্নভোগ ও ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব সেবার মাহাত্ব ব্যাখ্যা করে বললেন নবমীর সকালে পূজার পর শ্রী রাধামাধবের উদ্দেশ্যে রকমারী সাত্ত্বিক অন্নভোগ নিবেদন করা প্রথা সুগন্ধি চালের অন্ন রকমারী ব্যঞ্জন ক্ষীর পায়েশ ও মিষ্টি দেবীর প্রীতির্থে
01:29:02
নিবেদন করতে হয় তবে সবচেয়ে বড় নিয়ম হলো নিজে পালন করার আগে ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব এবং সাধুসন্তদের প্রসাদ খাওয়ানো সম্ভব হলে ভক্তিভরে সৎ পাত্রে বস্ত্র, ফল ও সাধ্যমত দক্ষিণা দান করা উচিত। কারণ কৃপাময়ী রাধারানী তার ভক্তদের দান, ধ্যান ও সেবা ভাব দেখলেই সবচেয়ে বেশি প্রীত হন। পারণের সময়সীমা [মিউজিক] ও খাদ্যের নিয়ম সম্পর্কে ব্যাসদেব সতর্ক করে বললেন, পারণের সবচেয়ে প্রধান শর্ত হলো সময়। পঞ্জিকায় নির্ধারিত নবমী তিথির নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই ব্রতিকে পারণ করতে হয়। পারণের সময় উপস্থিত হলে প্রথমে ভগবানের
01:29:41
চরণে নিবেদিত চরণামৃত ও প্রসাদী তুলসী মুখে দিয়ে উপবাস ভাঙতে হয়। এরপর প্রসাদ হিসেবে নিবেদিত সাত্তবিক অন্ন গ্রহণ করে ব্রত উদযাপিত হয়। পারণের খাবারে কখনোই পেঁয়াজ, রসুন বা কোন তামসিক উপাদান থাকা চলবে না। সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ও সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করাই নিয়ম। ব্যাসদেব ব্রতের উদযাপন বা উদযাপনের বিশেষ বিধান নিয়ে আরো বললেন, হে নারদ, যারা এই ব্রত নিয়মিত পালন করেন বা জীবনের কোন বিশেষ সময় সংকল্প করে উদযাপন করেন তারা নবমীর দিন হোম যজ্ঞের আয়োজন করতে পারেন। শ্রী রাধা নাম ও শ্রীকৃষ্ণ মন্ত্র উচ্চারণ করে ঘৃত
01:30:20
তিল ও ক্ষীর দিয়ে আহুতি দিলে সমস্ত পাপ ও রোগ ব্যাধি দূর হয়। ব্রত শেষে গুরুজনদের চরণে প্রণাম করে তাদের আশীষ গ্রহণ করতে হয়। মহর্ষি ব্যাসদেব শেষে ভক্তদের জন্য এক পরম আশ্বাসের কথা বললেন। যে ব্যক্তি এই প্রথাগত নিয়ম নিষ্ঠা ভরে মেনে রাধা অষ্টমী ব্রত পালন ও পালন করে দেবী রাধিকার স্বয়ং তার রক্ষাকবচ হয়ে ওঠেন। তার সংসারে কোনদিন দুঃখ, দারিদ্র্য বা অসন্তোষ প্রবেশ করতে পারে না। অন্তিমকালে তিনি গোলকধামে রাধাকৃষ্ণের নিত্য সেবার অধিকার লাভ করেন। শ্রীধামের সেই অপ্রাকৃত অভিশাপের নেপথ্য কারণ থেকে শুরু করে রাজা
01:30:58
বৃষভানু ও মাতা কীর্তিদার কঠোর তপস্যা ভাদ্র মাসের পরম শুভ শুক্লা অষ্টমীতে যমুনার শান্ত জলে ভাসমান সুবর্ণ পদ্দ্যের উপর দেবী রাধার অজনীজা প্রাকট্য বালকৃষ্ণের পরম পবিত্র স্পর্শে সেই অপূর্ব প্রথম নয়ন উন্মিলন আর ব্যাসদেবের মুখে বর্ণিত প্রথাগত ব্রতবিধি ও পারণ সূচি পরম পূজনীয় রাধা অষ্টমী ব্রতকথার এই পূণ্যময় যাত্রা আজ এখানে পরম মধুরতায় পূর্ণতা পেল। এই পুরো কাহিনী কেবল একটি পৌরাণিক উপাখ্যান নয়। এটি হল ভক্ত ও ভগবানের মধ্যকার পরম অনুরাগের জীবন্ত প্রমাণ। যখনই মর্তের বুকে ধর্মের ক্ষয় ঘটে কিংবা ভক্তের হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে তখনই
01:31:41
পরমেশ্বর ও তার আলহাদিনী শক্তি রূপ ধরে নেমে আসেন আমাদের মাঝে। দেবী রাধিকা হলেন সেই পরম স্নেহের করুণাময়ী রূপ। যিনি সামান্য রাধা নাম জপেই ভক্তের সমস্ত দুঃখ কষ্ট হরণ করে নেন এবং কৃষ্ণের অভয় চরণাবিন্দ প্রদান করেন। সংসারের নানা ঝঞ্ঝাট ও ব্যস্ততার মাঝে এই ভাদ্র মাসের ব্রতকথা শ্রবণ করাও এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়। এটি আমাদের শেখায় ভগবানকে পেতে বিশাল পান্ডিত্য বা ধনসম্পদের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন কেবল একটি নিষ্পাপ ও সরল হৃদয়ের। যে ঘরে শ্রী রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের যুগল রূপের পূজা হয়, যেখানে ব্যাকুল মন নিয়ে রাধা নাম গাওয়া হয়, সেই গৃহেই
01:32:30
স্বয়ং লক্ষ্মী ও নারায়ণের পরম কৃপা সদা সর্বদা বিরাজ করে। আসুন এই পরম ব্রতথার শেষে আমরা সবাই মিলে আমাদের মন ও প্রাণকে এক বিন্দুতে এনে কৃপাময়ী রাধারানী ও পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের পরম শ্রী চরণে ভক্তি ভরে প্রণাম জানাই। শ্রী রাধার চরণ কমলে আমাদের [মিউজিক] একটাই আকুল প্রার্থনা। হে ব্রজেশ্বরী হে জগৎ জননী আমাদের জীবনের সমস্ত কলুষতা দ্বিধা ও মনের গ্লানী [মিউজিক] মুছে দিয়ে তোমার পরম অচলা ভক্তি দান করো। তোমার কৃপায় যেন [মিউজিক] আমাদের প্রতিটি দিন সুখে শান্তিতে ও আনন্দের আলোয় ভরে ওঠে।
No comments: